নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই যদি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে বাংলাদেশ গত ৫৫ বছরে অন্য দেশের জন্য গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় কেটে গেলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে এখনো ভাবমূর্তির সংকটে পড়তে হয়। বিপুল জনসংখ্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মতো ভেদহীন জাতিবৈশিষ্ট্যের দেশ বিশ্বে খুব বেশি নেই।
বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ মানুষ এক ভাষায় কথা বলে, ৯০ শতাংশ মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক, সংস্কৃতি এক, সবার পোশাকপরিচ্ছদ এবং খাদ্যাভ্যাসও অভিন্ন। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র আসি আসি করেও শেষ পর্যন্ত আসে না। কখনো ধরাছোঁয়ার কাছে আসে, আবার ছুটে চলে যায়। জাতির ভেদহীনতা সত্ত্বেও ছোট ছোট কারণে মানুষের মনোজগতে এত বিশাল বিভেদের প্রাচীর খাড়া হয়ে হয়ে আছে যে, তারা একে অন্যের কাছেই আসতে পারে না। এ ব্যাপারে যে পক্ষটি সবচেয়ে বেশি অসহিষ্ণু ছিল, তারা তাদের অসহিষ্ণুতার চড়া মূল্য বারবার দিয়েছে, কিন্তু কোনো শিক্ষা গ্রহণ না করায় কখনো গণতন্ত্র বিদায় নিয়েছে, কখনো সমগ্র দেশ মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনগণ আশা করে যে, দেশ অনুরূপ পরিস্থিতিতে আর পড়বে না।
এ আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বিএনপি নির্বাচনে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহ কাটল। এখনই আগ বাড়িয়ে কিছু বলা সংগত নয়। তবে ‘সকালেই বোঝা যায় সারা দিন কেমন যাবে’ প্রবাদ বাক্যটি আমলে নিতে না চাইলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের বিদায় প্রক্রিয়া, চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়া, দায়িত্ব হাতে পাওয়া মাত্র কিছু কিছু মন্ত্রীর অবাঞ্ছিত বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, সরকার এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়তো এখনো তাঁর রাষ্ট্রীয় গুরুভারকে আকাক্সক্ষার চেয়েও অধিক ভেবে কী করণীয় অথবা কী বর্জনীয় তার কূলকিনারা করতে পারছেন না। গত ২৫ ডিসেম্বর জনসমুদ্রের মাঝে তিনি তাঁর যে রাষ্ট্র পরিচালকের করণীয় ও বর্জনীয় ‘পরিকল্পনা’র কথা বলেছিলেন, এখন বাস্তব দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাঁর চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতাদের ভিড়ে সেই পরিকল্পনা খোলাখুলি ঘোষণা করতে এবং সে অনুযায়ী নির্দেশনা দিতে তিনি কি নিজেকে লাজুক অনুভব করছেন? জাতি তাঁর ওপর বিপুল আস্থা রেখেছে, তাঁর দ্বিধাবোধের কোনো সুযোগ নেই।
দেশের উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে কী করণীয় তা তিনি নিজের ঘরে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। একটি বড় দলের প্রধান হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থেকেও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এখন তিনি বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি। কোনো দল ক্ষমতায় গেলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হতে খুব বেশি সময় লাগে না।
প্রায় দুই দশক বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী আওয়ামী শাসক গোষ্ঠীর হাতে যে জুলুম-নিপীড়ন সহ্য করেছে, অনেককে জীবন দিতে হয়েছে, বিনা বিচারে অসংখ্য নেতা-কর্মী কারাযন্ত্রণা ভোগ করেছেন, নিজ বাড়িতে ঘুমাতে পারেননি অনেকে। অতএব দলটি ক্ষমতায় আসার পর নিপীড়িত নেতা-কর্মীদেরও মনে এমন আশা-আকাক্সক্ষা জেগে ওঠা অমূলক নয় যে তাঁরা তাঁদের ত্যাগের উপযুক্ত মূল্য লাভ করবেন।
কিন্তু একটি দল যখন ক্ষমতায় আসে, দলের প্রধান সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর কাছে যে দল মুখ্য থাকে না, শপথ অনুযায়ী দেশের জনগণই মুখ্য হয়ে ওঠে, তা দলের লোকজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপলব্ধি করেন না। তাঁরা তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি ও ত্যাগের মূল্য আশা করেন। এখানেই বিপত্তির সূচনা হয়। সে বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে না পারলে সরকারের পক্ষে এবং প্রধানত সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জাতীয় স্বার্থে ফলপ্রসূ কিছু করা যে সম্ভব নয়, তা উপলব্ধি করে প্রথমেই তাঁকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, বা করা উচিত।
তাঁর সতর্কতার মধ্যে জরুরি বিষয় হওয়া উচিত সাবেক সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল আমলাদের প্রতি দৃষ্টি রাখা। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিকালে দেখা গেছে, আমলাদের একটি বড় অংশ নতুন কিছু বা পরিবর্তনকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন না এবং তাঁদের কাজকর্মেও তা ফুটে ওঠে। তাঁরা চেষ্টা করেন নতুন সরকারকে নিয়মিত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে জনগণকে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি প্রদান করে যে ক্ষমতায় গেলে তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে কী করবে। তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রথমেই বাধাপ্রাপ্ত হয় আমলাতন্ত্রের কাছে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় তারা যদি প্রাথমিক অবস্থায়ও আমলাতন্ত্রনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে তারা তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে পদে পদে বাধার মুখে পড়বে। নতুন সরকার যদি তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি এবং কর্মক্ষেত্রের ওপর নৈতিক অবস্থান দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে রেখে আমলাতন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করতে পারে, তাহলে সরকারের মেয়াদের পরবর্তী সময় পর্যন্ত ‘ক্ষমতার অভিজাত’ শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত আমলাতন্ত্র সরকারের কাজে আর বাধার সৃষ্টি করতে সাহসী হবে না বলে আমার বিশ্বাস। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত একটি প্রবাদ বিশেষভাবে প্রযোজ্য যে, ‘লোহা গরম থাকতে আঘাত করলে ইচ্ছামতো আকৃতি দেওয়া যায়।’
অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রধান স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে তাদের সংগঠন ও সরকার পরিচালনা করেছেন। বিরোধী দলের অস্তিত্বকে সহ্য করতে পারেননি। জনগণকেও স্বেচ্ছাচারী মনোভাব নিয়েই পরিচালনার চেষ্টা করেছেন। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ ছিলেন বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা। বিএনপি আওয়ামী সংস্কৃতিতে লালিত ও পরিচালিত কোনো দল নয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও অংশগ্রহণ এবং বিরোধী পক্ষের প্রতি আপাতদৃশ্যমান সহনশীল আচরণ বিএনপির শক্তি ও জনপ্রিয়তার মূল উৎস।
যেহেতু বিএনপি এখন সরকার গঠন করেছে, যৌক্তিক কারণে দলটি তাদের যোগ্য ও ত্যাগী জনশক্তিকে পুরস্কৃত করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, এই কাজটি করতে গিয়ে দলটি যাতে কোনো চামচা বাহিনী গড়ে না তোলে। অতীতে চামচা বাহিনীর চাটুকারিতা ও তোষামোদে, দলের বা কোনো বড় বড় নেতার নাম ভাঙিয়ে চামচাদের বৈধ সুযোগসুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় এবং বিরোধী দলের সমর্থকদের ওপর জুলুম চালিয়ে দল ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাটুকারিতাকে রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত এই ভেবে চাটুকারিতাকে উপভোগ করতেন যে কীভাবে তাঁর পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার গোষ্ঠীকে দাসতুল্য করে তোলা সম্ভব হয়। চাটুকারিতা ও তোষামোদকে মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়ায় দেশজুড়ে নজিরবিহীনভাবে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সবার নামে নানা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়েছিল। যা তাঁর পতনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নামগুলো মুছে ফেলা হয়েছে এবং স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ধুলায় মিশে গেছে। এই পরিণতিই বাংলাদেশের যেকোনো শাসকের জন্য তোষামোদকারী ও চাটুকারদের খপ্পরে পড়লে কী খেসারত দিতে হয় একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকা উচিত।
পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমনকি স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে সরকারপ্রধানদের অতিমাত্রায় প্রশংসা করা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা সহসা কাটিয়ে ওঠার মতো নয়। এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিনও নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে তাঁর নামের আগে-পরে কোনো বিশেষণ যোগ করতে নিষেধ করার মধ্য দিয়ে একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। ‘শেরেবাংলা,’ ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র,’ ‘বঙ্গবন্ধু,’ ‘পল্লীবন্ধু,’ ‘দেশনেত্রী,’ ‘দেশরত্ন,’ ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা,’ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ ইত্যাদি আলংকারিক বিশেষণের কী মূল্য ও উপযোগিতা থাকতে পারে, যদি অপশাসনের কারণে কাউকে জনরোষের শিকার হয়ে ক্ষমতাচ্যুত বা প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়! কোনো রাষ্ট্র পরিচালক যদি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিতে না পারেন, তাহলে তাঁর মূর্তি স্থাপন করেই কি তাকে স্মরণীয় রাখা সম্ভব? আরোপিত কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না।
প্রায় সাড়ে নয় শ বছর আগে পারস্যে সেলজুক সাম্রাজ্যের দুজন শাসক সুলতান আল আরসালান এবং সুলতান মালিক শাহের অধীনে ৩০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আবু আলী আল-হাসান ইবন আলী তুসি। যিনি ‘নিজাম-উল-মুলক’ নামেই অধিক খ্যাত। দক্ষতার সঙ্গে সাম্রাজ্য পরিচালনার কৌশল ও রীতিনীতির ওপর লেখা তাঁর গ্রন্থ ‘সিয়াসতনামা’র মূল বক্তব্য, ‘যার যা প্রাপ্য তাকে তা দাও’, যার মর্ম হচ্ছে, শাসকের অনুরাগে কেউ যাতে সুবিধাভোগী হয়ে না ওঠে এবং শাসকের বিরাগে দুর্বল প্রজাও যাতে সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।
তিনি আরও বলেছেন, ‘নিজের পারিষদবর্গকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যে শাসকের নেই, তিনি কখনো জনগণকে শাসন করতে পারবেন না।’ গ্রন্থের আরেক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যকলাপের ওপর সব সময় গোপন নজরদারি রাখা উচিত যে তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কিনা। কারণ দেশের ভালোমন্দ তাঁদের ওপরই নির্ভর করে। মন্ত্রী যদি চরিত্রবান এবং নির্ভীক বিচারক হন, তাহলে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত। তখন সৈনিক ও শ্রমিক শ্রেণি (জনগণ) সুখে থাকে। দেশে বিরাজমান থাকে শান্তিশৃঙ্খলা, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকে এবং শাসক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকেন। মন্ত্রীরা যদি খারাপ (দুর্নীতিপরায়ণ) হন, তাহলে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়, শাসক দিশাহারা হয়ে পড়েন এবং দেশের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে।’ তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন : ‘তিনিই সেরা শাসক, যিনি বিদ্বানের সাহচর্যে থাকেন, অন্যদিকে বিদ্বানদের মধ্যে তারাই অধম, যারা শাসকের সাহচর্য কামনা করেন।’