ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ’ অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। বেলা ৩টায় শুরু হওয়া এ সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। বক্তারা বলেন, হাদির আক্রান্তে, দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। হাদির ওপর গুলির ঘটনায় বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে।
সমাবেশস্থলে আসা নেতা-কর্মীদের অনেককেই হাতে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানান এবং দোষীদের বিচারের দাবি তোলেন। সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ গোলাম পরওয়ার বলেন, হাদির ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটা প্যাকেজ প্রোগ্রাম। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে কোটি কোটি টাকা বেতন দেওয়া হয়, কিন্তু তারাও এ হামলা সম্পর্কে বলতে পারেনি। তারাও ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টা রুখতে পারেনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, যখনই দেশ আক্রান্ত হয়েছে তরুণরা এগিয়ে এসেছে। দেশ আক্রান্ত হওয়ার ফলাফল জুলাই। বিপ্লবীরা এখনো ঐক্যবদ্ধ। এক হাদির আক্রান্তে, দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। দেশের আইনশৃঙ্খলা এখনো শৃঙ্খলিত হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, হাদির ওপর গুলিবর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে। তাতেই স্পষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। নৈতিকভাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার স্বপদে বহাল থাকতে পারেন না।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, দিল্লির অধিপত্য রুখতে আমাদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এই সরকার হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে বসে খুনি হাসিনা দেশব্যাপী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের টার্গেট কিলিংয়ে লিপ্ত হয়েছে। খুনি হাসিনাকে যদি ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করে খুনি হাসিনাকে ধরে আনার পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আপ বাংলাদেশ, লেবার পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের নেতা অংশ নেন।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমিতি রাওয়া ক্লাবের সভাপতি কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান, খেলাফত মজলিসের নেতা আহমদ আলী কাসেমী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, আপ বাংলাদেশের সদস্যসচিব আরেফিন মোহাম্মদ, জনতার দলের মহাসচিব আজম খান, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ফাতিমা তাসনিম জুমা প্রমুখ।
জনতার দলের বিক্ষোভ : ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জনতার দল। গতকাল দুপুরে শাহবাগ মোড়ে দলটি মিছিল করে। এ সময় হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান জনতার দলের নেতারা।
তারা বলেন, এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই পারে একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। এর জন্য দেশব্যাপী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
এ সময় দলটির সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল, মহাসচিব আজম খান, মুখপাত্র মেজর (অব.) ডেলিস খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাব্বির, মেজর জেনারেল (অব.) মাহবুবুল আলম, সহদপ্তর সম্পাদক মো. আতিকুল ইসলাম জুনেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে শাহবাগ অবরোধ, মন্ত্রণালয় ঘেরাও : ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান শরিফ হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদ ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় ছাত্রশক্তি। গতকাল রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা প্রায় তিন ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তাঁদের ‘হাদি ভাই গুলি খায়, কষ্ট পায় হাজার ভাই’, ‘হাদি ভাই হাসপাতালে, খুনি কেমনে বাইরে ঘুরে’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘এক-দুই-তিন-চার’, বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়। পরে একই দাবিতে আগামীকাল ফের শাহবাগ ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ডাকসু : ওসমান হাদির ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারসহ তিন দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা ডাকসু ভবনের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি বাংলা একাডেমি দোয়েল চত্বর হাই কোর্ট হয়ে দুই দফা পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষা ভবনের সামনে অবস্থান নেন তাঁরা। পরে ভিপি সাদিক কায়েমসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান ডাকসুর ১০ নেতা। সেখানে তিন দফা দাবি জানান তাঁরা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে উপদেষ্টাকে নিয়ে ব্রিফিং করেন ডাকসু নেতারা।
এ সময় ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম তিন দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টদের দ্রুত জবাবদিহি, যাদের গাফিলতি প্রমাণিত হবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ছোট ভাই সাদিক কায়েমের প্রতিটি দাবি যৌক্তিক। এর আগেও বলেছি; এই পদক্ষেপগুলো আরও বেগবান করতে হবে। আমরা তাঁদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।’