চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটনার ১৫ দিন পার হলো। এখনো দগ্ধ শরীর নিয়ে বাঁচার জন্য যুদ্ধ করছে তিন শিশু। এর মধ্যে চার বছরের আয়েশা আক্তার ৪৫ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে, ১০ বছরের উম্মে আইমান স্নিগ্ধা ৩৮ শতাংশ পোড়া নিয়ে ও ছয় বছরের ফারহান আহমেদ আনাছ ৩০ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে লড়ছে হাসপাতালে। তিনজনের অবস্থাই খারাপ। এ তিন শিশু পরস্পর চাচাতো ভাই-বোন। এর মধ্যে একে একে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন বিস্ফোরণে আক্রান্ত তাদের পিতামাতাসহ ছয় অভিভাবক। এখন তিনটি অবুঝ শিশু ছাড়া আর কেউ রইল না।


প্রশ্ন আসছে- তাহলে কী হবে নিষ্পাপ এই তিন শিশুর- কে নেবে তাদের দায়িত্ব? মা-বাবাহীন তিনটি শিশুর গন্তব্যই বা কোথায়? মামারা বলে গেছেন, ওরা দাদির কাছে থাকবে। তাদের দাদি নিজেই বার্ধক্যে ভুগছেন।


জানা যায়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর আবাহনী মাঠসংলগ্ন ওয়াপদা সড়কের ছয়তলা ভবনের হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয়তলার একটি ফ্ল্যাটে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটে। ফ্ল্যাটটিতে দুই সন্তান, স্ত্রী নিয়ে থাকতেন গ্যারেজ ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন।  বেড়াতে আসায় ওই দিন বাসায় ছিলেন তার বড় ও মেজো ভাইসহ তাদের স্ত্রী এবং চার সন্তান। বিস্ফোরণে এই নয়জনের সবাই দগ্ধ হয়। প্রথমে তাদের নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। ঢাকায় নেওয়ার পথে কুমিল্লায় মারা যান সাখাওয়াতের স্ত্রী নুরজাহান আক্তার রানী (৪০)। পরদিন মঙ্গলবার সকালে মারা যান সাখাওয়াতের সন্তান শাওন (১৬), দুপুরে মারা যান সাখাওয়াতের ছোট ভাই সামির আহমেদ (৪০), ওই রাতেই মারা যান সামিরের স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি (৩০)। এ ঘটনায় তিন পরিবারের মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে এখানে চিকিৎসাধীন আছে বড় ভাইয়ের মেয়ে উম্মে আইমান (১০) এবং মেজো ভাইয়ের দুই ছেলে- মেয়ে ফারহান আহমেদ (৬) ও আয়েশা (৪)। হাসপাতালে তাদের দেখাশোনা করছেন ফুফাতো ভাই নাজমুল হাসান।   


নাজমুল হাসান বলেন, একটি দুর্ঘটনায় ছয়টি প্রাণ চলে গেল। শিশুদের চিকিৎসা চলছে। আমাদের চিন্তা চিকিৎসা শেষে শিশুরা কোথায় ফিরবে? ওদের তো মা-বাবা কেউ নেই। মামারা বলে গেছেন, ওরা দাদির কাছে থাকবে। তাদের দাদি নিজেই বার্ধক্যে ভুগছেন। নানা বেঁচে নেই। এ অবস্থায় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে দুশ্চিন্তা। 


বার্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আনাসের শরীরের ১৯ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে (ফ্লেম বার্ন)। বর্তমানে তাকে কেবিনে রাখা হয়েছে। উম্মে আইমান স্নিগ্ধার শরীরের ৩০ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে। তার একটা অপারেশনও হয়েছে। কিন্তু এখনো বিপদমুক্ত হয়নি। মাঝে মাঝে জ্বরও আসছে। তবে তাদের এখন আইসিইউ লাগছে না। ইনফেকশন এড়াতে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।  


জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, তিনজন শিশুর অবস্থাই অত্যন্ত খারাপ ছিল। আল্লাহর রহমত ও চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় তারা এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। দুজনকে কেবিনে ও একজনকে ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তাদের মা-বাবা নেই। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা এখন তাদের দেখাশোনা করছেন। জানা যায়, সাখাওয়াত হোসেন হালিশহরে মোটর পার্টসের ব্যবসা করতেন। তাঁর ভাই সুমন পর্তুগাল প্রবাসী। গত ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে আসেন চিকিৎসা ও ঈদ করার জন্য। ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে সাখাওয়াতের বাসায় সুমন পরিবার নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আসেন। চিকিৎসা শেষে তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। আরেক ছোট ভাই শিপন হালিশহরেই থাকে। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার বাগমারা গ্রামে।