মন খারাপ আর হতাশার মধ্য দিয়ে আজ শেষ হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা। গতকাল ছিল মেলার ১৭তম দিন। গতকাল ছুটির দিনে মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায় আর প্রবেশদ্বার বন্ধ হয় রাত ৯টায়।
গতকাল দর্শনার্থীর উপস্থিতি ও বিকিকিনিতে নিভুনিভু প্রদীপ যেন শেষ সময়ে জ্বলে ওঠে। এ দিন মেলাজুড়ে ছিল দর্শনার্থী ও ক্রেতার ভিড়। প্রায় সবার হাতে হাতে ছিল বই। তবে এর আগের রাতে শিলাবৃষ্টির কারণে বেশ কয়েকজন প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শিলাবৃষ্টিতে নিজের ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরে জোনাকী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘যখন বিক্রি জমে উঠেছিল, তখনই শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। আমার প্রায় ৫০ হাজার টাকার বই ভিজে গেছে। এ ক্ষতি আমি কোনোভাবেই পুষিয়ে তুলতে পারব না। মন্দা অবস্থার এ মেলায় হঠাৎ বৃষ্টি প্রকাশকদের মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।’
বিকালে মেলাপ্রাঙ্গণে কথা হয় রাজধানীর লালবাগ থেকে আসা শরীফুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর মেলার শুরুতে আসি। কিন্তু এবার রমজানের কারণে মেলায় আসা হয়নি। তবে এসে খুবই ভালো লাগছে।’ কী বই কিনলেন-জানতে চাইলে এই তরুণ পাঠক বলেন, ‘সায়েন্সফিকশন আর মোটিভেশনাল বই কিনলাম। তবে পরিবেশ ভালো লাগছে।’ বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫৭টি। আর গত ১৭ দিনে নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৭৭৭টি।
প্রকাশকদের পাঁচ দাবি : বইমেলার মূল্যায়ন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে সৃজনশীল প্রকাশক ঐক্য। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবিগুলো তুলে ধরেন তারা। দাবিগুলো হলো প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের কাছ থেকে অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি কেনা, প্রকাশনাশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে এ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি বই কেনার বাজেট বৃদ্ধি করা, স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিগুলো উন্নত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া লাইব্রেরি পুনরায় চালু করা, অমর একুশে বইমেলার ওপর প্রকাশনাশিল্পের এই মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি’ হালনাগাদ করা, বাংলা একাডেমি, বাপুস এবং প্রকাশক ঐক্যর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার ব্যবস্থা করা। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার বার্তা হিসেবেই নিজেদের নিশ্চিত ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি জেনেও আমরা নির্বাচন-পরবর্তী এ প্রতিকূল বাস্তবতায় ও পবিত্র রমজান মাসে মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে মেলা নিয়ে আমাদের প্রাথমিক আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মম বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তারা বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি কমেছিল ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ ভাগ। আর চলমান ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি কমেছে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ ভাগ! সামগ্রিকভাবে অন্যান্য স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এ বছর বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও শোচনীয়। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ ভাগ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি, যার মধ্যে প্রায় ৩০ ভাগ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। নিজেদের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে প্রকাশকরা বলেন, প্রতি বছর বইমেলায় ৩০-৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির যে মুখরোচক তথ্য প্রচার করা হয়, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই; প্রকৃত বিক্রি তার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখি একটি ১০০ কোটি টাকার বইমেলার। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার একটি সুনির্দিষ্ট মার্কেটিং বাজেট থাকলে আগামী তিন-পাঁচ বছরের মধ্যেই এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। বইমেলার সামগ্রিক আয়োজনে প্রকাশকরা যদি চালকের আসনে থাকেন এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ সহযোগিতা করে, তবে মেলার চেহারাই পাল্টে দেওয়া সম্ভব।