কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের গা ঘেঁষে পাটুয়ারটেক এলাকা। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে নীল জলরাশির উত্তাল সমুদ্র। প্রকৃতির এ অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে পর্যটকদের অবকাশের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল বাঁশ আর কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন তিন তলা স্থাপনা ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’। কিন্তু গতকাল ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পরিণত হলো ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে। রান্নাঘর থেকে আসা বিকট শব্দের পর মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুনের লেলিহান শিখা। চোখের পলকেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘুরতে আসা ১০ জন পর্যটক। আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরও ৯ জন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এখনো দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয়দের কয়েক ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর এখন সেখানে পড়ে আছে কেবলই কয়লা আর ছাইয়ের স্তূপ। স্বজন হারানো মানুষের গগনবিদারী আহাজারিতে পাটুয়াটেক এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় বিভীষিকাময় দৃশ্য। দৃষ্টিনন্দন সেই তিন তলা কাঠের রিসোর্টের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে আছে পোড়া কাঠ, বাঁশ আর টিনের চালা। বাতাসে ভাসছে পোড়া গন্ধ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী সরিয়ে সম্ভাব্য আলামত এবং আর কোনো লাশ আছে কি না খুঁজছিলেন। উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে স্বজনদের কান্না। পুলিশ টুপটুপ রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। ১৮ কিলোমিটার দূরত্বের ফায়ার স্টেশন থেকে ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নেভাতে সক্ষম হন ফায়ার কর্মীরা। প্রথমে ছয়জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তিন তলার দুটি শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয় আরও চারজনের লাশ। তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
কী ঘটেছিল সেই ভয়াল সকালে : ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সেই মুহূর্তের চিত্র। রিসোর্টটিতে ৯টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয় কক্ষে ১৬ জন পর্যটক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। গতকাল সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টের নিচতলায় রান্নাঘরে হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়দের ধারণা, এটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা জেনারেটরের শর্টসার্কিট হতে পারে। শব্দ হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন কাঠের দেয়ালে ধরে যায়। পুরো রিসোর্টটি বাঁশ, কাঠ ও ছন দিয়ে তৈরি এবং সমুদ্রের দিক থেকে প্রবল বাতাস বইছিল, তাই আগুন তিন তলায় ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। ঘুমন্ত পর্যটকরা প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন, কিন্তু অনেকেই বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। গগনবিদারী আর্তনাদ শুনে স্থানীয়রা ছুটে এলেও তাঁরা কোনো সহযোগিতা করতে পারেননি। আগুনের লেলিহান শিখার উত্তাপে ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেননি কেউ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিভীষিকাময় বর্ণনা : পাটুয়াটেকের বাসিন্দা কবির আহমদ ও আবদুল জব্বার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে ওঠেন। তাঁরা বলেন, ‘সকালে বিকট শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে আসি। দেখি দাউদাউ করে জ্বলছে পুরো রিসোর্ট। ভিতরে তখনো মানুষ আটকে পড়া। তাঁদের বাঁচার আকুতি আর চিৎকারে আমাদেরও কাঁদার উপক্রম। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে কাছেও যাওয়া যাচ্ছিল না। চোখের সামনে মানুষগুলো পুড়ে মারা গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করা হয়। কিন্তু উখিয়া বা কক্সবাজার শহর থেকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে কাঠ আর বাঁশের স্থাপনাটি পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে ধসে পড়ে।’
যাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই : একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু। ছুটি কাটাতে এসে লাশ হয়ে ফিরবেন তা হয়তো কল্পনাও করেননি এই পর্যটকরা। উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে ১০ জনের দগ্ধ ও বিকৃত লাশ উদ্ধার করেন। এদের মধ্যে ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা আশিকুলের পরিবারেরই ছয় সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন মৃত্যুর মিছিলে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তাঁরা হলেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), ঢাকার খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছরের শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। নিহত ব্যক্তিদের শরীর এমনভাবে পুড়ে গেছে যে স্বজনদের পক্ষে তাঁদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠে। প্রশাসন জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লাশ হস্তান্তর করা হবে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন মো. নাফিস তেহামী ও লায়লা জাহান নাবিলা। নাফিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চায়নিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার প্রোগ্রামের আর নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
হাসপাতালে দগ্ধদের আর্তনাদ : অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ দগ্ধ হয়েছেন ৯ জন। তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন দগ্ধ ব্যক্তিরা। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘আহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের শরীরের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালিতে ধোঁয়া ঢোকায় শ্বাসকষ্টেও ভুগছেন অনেকে।’ আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মান্নান (৩২), ফাহমিদা (৩২), মাসুদ (৩০) ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা (৩০), ডা. শিহাব উদ্দিন সাদি (৩১), ডা. নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), আশিক (২৮), আইরিন ও ইমা।
ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও চলছিল রিসোর্ট : সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও ক্ষোভের বিষয়টি জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তিনি জানান, তিন মাস আগে জুনে এ রিসোর্টটি পরিদর্শন করেছিল ফায়ার সার্ভিস। বাঁশ ও কাঠের তৈরি হওয়ায় এবং কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় এটিকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ সেই নোটিসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পরপরই রিসোর্টের মালিকসহ সব স্টাফ পালিয়ে গেছেন। তাঁদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ চরম অবহেলায়ই ১০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান : এ ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি রয়েছেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার ও উখিয়া থানার ওসি মো. আতিকুর রহমান মজুমদার জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং এতে মালিকপক্ষের গাফিলতি কতটুকু, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক মালিককে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এম এন সাজেদুর রহমান নিশ্চিত করেছেন, অবহেলার কারণে মৃত্যু সংঘটিত হওয়ার দায়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘পর্যটননগর কক্সবাজারে এর আগে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং একসঙ্গে এত পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ দুর্ঘটনা পর্যটন শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে এবং অগ্নিনিরাপত্তা আইন না মেনে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব কাঠের ও বাঁশের রিসোর্ট আগামীতে যেন আর কোনো মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।’
এখনো নিখোঁজ দুজন : টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের লাশ সদর হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে এখনো দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। গত রাত ৮টার দিকে ১০টি লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে বুঝিয়ে দেয় কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ।
লাশের পরিচয়ের ভরসা কেবল ডিএনএ : কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের দেহই পুড়ে একেবারে অঙ্গার হয়ে গেছে। লাশগুলো এতটাই বীভৎসভাবে পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়েছে যে, উপস্থিত স্বজনদের পক্ষে তা দেখে শনাক্ত করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজিদুর রহমান বলেন, লাশগুলোর অবস্থা এতটাই করুণ যে চেহারা দেখে চেনার কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই। তাই ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পরই কেবল নিশ্চিত হওয়া যাবে তাদের প্রকৃত পরিচয়। তাই লাশগুলোর সম্ভাব্য আত্মীয়স্বজনদের ডিএনএ নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হবে।
ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি দেওয়ান ফয়সালের স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা। স্ত্রী পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া আমার স্ত্রীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই ডিএনএ পরীক্ষার কথা বলেছে প্রশাসন।