সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহতদের মধ্যে দেশে নিয়ে আসা ৯ জনের দাফন গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজন নওগাঁর এবং একজন রাজশাহী ও একজন নাটোরের। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- নওগাঁ : আগুনে পুড়ে নিহত নওগাঁর আত্রাইয়ের সাতজনের লাশ দেশে আসার পর গতকাল সকালে মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে একসঙ্গে সবার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের লাশ দেশে আসে। তাদের মধ্যে সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। লাশগুলো বিমানবন্দর থেকে প্রশাসনের সহায়তায় রাত ২টার দিকে আত্রাই আসে। এদিকে একসঙ্গে দুটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গন্ডগোহালী গ্রামে ঢুকতেই কান্নার রোল পড়ে যায়। নিহতদের মধ্যে এই গ্রামের দুই ভাইসহ চারজন রয়েছেন। সন্তানদের লাশ দেখে আর্তনাদ করতে করতে ভেঙে পড়েন মায়েরা। কেউ দুই হাত তুলে সন্তানের বেহেশত কামনা করছিলেন, কেউ আবার শেষবারের মতো সন্তানের নাম ধরে ডাকছিলেন। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। জানাজা শেষে লাশগুলো নিজনিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পরে গতকাল জুমার নামাজের পর পারিবারিকভাবে দ্বিতীয় দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান, আত্রাই থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয়রা অংশগ্রহণ করেন। জানাজার নামাজ শেষে লাশগুলো নিহতদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিবারগুলোকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তাদের ভবিষ্যতেও সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। বাকি লাশগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত।
রাজশাহী : সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্যামল উদ্দিন মাঝির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে শ্যামলের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকাল চারটার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে শ্যামল উদ্দিনসহ আরও ৯ বাংলাদেশির লাশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। এরপর তাদের স্বজনদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। শ্যামল উদ্দিন রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রামের বাসিন্দা। লাশ দেশে আশায় বিমানবন্দরে নিতে গিয়েছিলেন তার জামাতা মিজানুর রহমান। মিজানুর রহমান জানান, বেলা ১১টার দিকে বাবার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বজনরা ছাড়াও আশপাশের এলাকার মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে দাফন করা হয়েছে।
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদ বলেন, ‘নিহতের খবর শোনার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া তারা বিমানবন্দরে ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছে। যেহেতু নিহতের তিন মেয়ে। আমি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বলেছি তাদের দেখে রাখতে। যেহেতু তারা পড়াশোনা করেন, আমরা তাদের সহযোগিতা করব।’
নাটোর : সৌদি আরবে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নাটোরের রবিউলের লাশ গতকাল জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের মহিষডাঙ্গা ভট্টপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। রবিউল ইসলাম হৃদয় মহিষডাঙ্গা গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে। অগ্নিকাণ্ডে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার তিনজন প্রবাসীর মৃত্যু হয়। তবে প্রথম পর্যায়ে রবিউলের লাশ এলেও বাকি দুজনের লাশ এখনো আসেনি। নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল ইমরান খান বলেন, সৌদি আরবে নিহত নলডাঙ্গার আরও দুজনের লাশ শনাক্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার রাতেই প্রশাসনের সহায়তায় রবিউলের লাশ তার গ্রামের বাড়ি নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামে পৌঁছায়।
লাশ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে রাত থেকেই স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন। স্বজনরা জানান, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রায় পাঁচ বছর আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান রবিউল। সেখানে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন বৈধ কাগজপত্র না থাকায় লুকিয়ে কাজ করতে হয়েছে তাকে। প্রায় তিন বছর পর তিনি বৈধ কাগজপত্র পান। গত দেড় বছরে কিছু টাকা পরিশোধ করলেও পরিবারের ঋণ এখনো পুরোপুরি শোধ হয়নি। ঋণ পরিশোধ করে গ্রামে বাবা-মায়ের জন্য বাড়ি তৈরি শেষে কিছুদিন পর দেশে ফেরার কথা ছিল তার। তবে দেশে ফিরেছে তার নিথর দেহ।