কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এআই প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।


সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেই এক প্রবন্ধে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন কিছুটা ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এ খাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বিধিবিধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।


তবে এ অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এআই কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যেই ‘বিপুল অপরাধমূলক ও নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা’ রয়েছে। এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে তিনি এমন একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেন, যা শেষ পর্যন্ত চীনকে সুবিধা দিতে পারে। ট্রাম্প আরও বলেন, এআই প্রতিযোগিতায় যে পক্ষ জয়ী হবে, তারাই পুরোপুরি জয়ী হবে।


এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন দ্রুত বিকাশমান এআই খাতকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে নীতিমালা তৈরির চেষ্টা করছে, তখন এ খাতের পেছনে থাকা কোম্পানিগুলোর আর্থিক শক্তিও নজর কেড়েছে। চিপ, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে চ্যাটবট ও এআই সফটওয়্যার—সব মিলিয়ে এআই এখন বহু ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে।


এআই দুনিয়ায় কারা কোথায়?

এআই বলতে সাধারণত চ্যাটবট বা বড় ভাষা মডেল (এলএলএম) বোঝানো হলেও এগুলো আসলে বিশাল একটি শিল্পব্যবস্থার দৃশ্যমান অংশ মাত্র। এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক চিপ, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্কিং এবং ব্যবসায়িক সফটওয়্যারের বিশাল অবকাঠামো।


বিস্তৃতভাবে এআই খাতকে তিনটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়—হার্ডওয়্যার, ক্লাউড ও কম্পিউটিং এবং সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন।


১. হার্ডওয়্যার

এআই শিল্পের ভিত্তি তৈরি করেছে সেই কোম্পানিগুলো, যারা এআই চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিপ তৈরি বা নকশা করে। পাশাপাশি ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ও নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও এ স্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


চিপ নকশাকারী কোম্পানির মধ্যে রয়েছে এনভিডিয়া, মারভেল, এএমডি, ব্রডকম ও ইন্টেল। এ প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ), এআই অ্যাক্সিলারেটর এবং অন্যান্য উন্নত চিপের নকশা তৈরি করে।


অন্যদিকে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি বা টিএসএমসি-র মতো প্রতিষ্ঠান এসব চিপ বাস্তবে তৈরি করে।


এছাড়া অ্যারিস্তা নেটওয়ার্কস, ভার্টিভ ও ইটন-এর মতো কোম্পানি ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণ এবং নেটওয়ার্কিং অবকাঠামো তৈরি করে।


২. ক্লাউড ও কম্পিউটিং

চিপ থাকলেই এআই মডেল চালানো যায় না। বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজন বিশাল কম্পিউটিং ক্ষমতা। এই জায়গায় কাজ করে ক্লাউড ও কম্পিউটিং কোম্পানিগুলো।


এ খাতের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে অ্যালফাবেটের গুগল ক্লাউড, মাইক্রোসফটের অ্যাজুর, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) এবং ওরাকল। এসব ‘হাইপারস্কেলার’ কোম্পানি বিশ্বজুড়ে বিশাল ডেটা সেন্টার পরিচালনা করে এবং এআই কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং, স্টোরেজ ও নেটওয়ার্কিং সুবিধা দেয়।


এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ‘নিওক্লাউড’ নামে নতুন ধরনের কোম্পানির উত্থান ঘটেছে। কোরউইভ, ল্যাম্বডা, ক্রুসো, নেবিয়াস ও এনস্কেল-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা সরবরাহে বিশেষায়িত।


৩. সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন

এআই প্রযুক্তির যে অংশটি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা সরাসরি ব্যবহার করে, সেটি এই স্তরে পড়ে।


এখানে রয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাব’ বা সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, এক্সএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও মেটা এআই বড় ভাষা মডেল ও অন্যান্য উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই নিজেদের কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতেও বিনিয়োগ করছে।


এছাড়া প্যালান্টির, সার্ভিসনাও, সেলসফোর্স ও স্নোফ্লেক-এর মতো এন্টারপ্রাইজ এআই কোম্পানি ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা এবং তথ্য বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে।


এআই কোম্পানিগুলোর আর্থিক মূল্য কত?

এআই খাতে সরাসরি সম্পৃক্ত শীর্ষ ১০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন অন্তত ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার।


এই অঙ্ক বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য সব দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) থেকে বেশি। এমনকি চীনের পুরো অর্থনীতির আকারের চেয়েও এটি বড়।


এআইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সবচেয়ে মূল্যবান ২০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে প্রযুক্তি, চিপ, ক্লাউড অবকাঠামো এবং সফটওয়্যার—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই রয়েছে।


এনভিডিয়া: এআই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় হার্ডওয়্যার শক্তি

এআই-কেন্দ্রিক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো এনভিডিয়া। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার।


এনভিডিয়া মূলত গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) ও এআই অ্যাক্সিলারেটর তৈরি করে। এসব চিপ এআই মডেলের বিপুল পরিমাণ গণনাকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে ব্যবহৃত হয়।


বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই মডেল তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ও বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলো এনভিডিয়ার চিপ ব্যবহার করে। ফলে এআই অবকাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে কোম্পানিটির ব্যবসাও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।


অ্যাপল: এআইয়ের আরেক বৃহৎ খেলোয়াড়

প্রধানত হার্ডওয়্যার কোম্পানি হিসেবে পরিচিত অ্যাপলও এআইয়ের সঙ্গে ক্রমেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাবে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলার।


অ্যাপল ডিভাইসে এআই-ভিত্তিক নানা সুবিধা যুক্ত করার পাশাপাশি ২০২৬ সালে ‘সিরি এআই’ চালু করেছে। এই সেবা গুগলের জেমিনি মডেলের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে এবং এ জন্য গুগলের সঙ্গে লাইসেন্সিং চুক্তি করেছে অ্যাপল।


টিএসএমসি: এআই চিপ তৈরির কারিগর

এআই দুনিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)। কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার।


এনভিডিয়া, ব্রডকম ও এএমডির মতো কোম্পানি চিপের নকশা তৈরি করলেও সেগুলোর সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ তৈরির বড় দায়িত্ব টিএসএমসির ওপর। বিশাল পরিসরে উন্নত চিপ উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।


বর্তমানে বিশ্বের ফাউন্ড্রি বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি টিএসএমসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।


তালিকায় নেই, কিন্তু মূল্যায়নে বিশাল—অ্যানথ্রপিক

এআই খাতের সবচেয়ে আলোচিত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একটি অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি ‘ক্লড’ সিরিজের এআই মডেল তৈরি করে।


২০২৬ সালের মে মাসে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বেসরকারি এআই কোম্পানিগুলোর একটি।


অ্যানথ্রপিক ২০২৬ সালের জুনে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর জন্য আবেদন করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।


তবে আইপিওর সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে এবং বেসরকারি কোম্পানির মূল্যায়ন ও বাজারমূল্য এক বিষয় নয়—শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর প্রকৃত বাজারমূল্য পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।


ওপেনএআই: ৮৫২ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি

চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইও এআই শিল্পের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি জিপিটি সিরিজের বড় ভাষা মডেল তৈরি করে।


ওপেনএআইয়ের মূল্যায়ন প্রায় ৮৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুনে কোম্পানিটি আইপিওর জন্য আবেদন করলেও পরবর্তী সময়ে ২০২৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


এক্সএআই থেকে স্পেসএক্স

ইলন মাস্কের এক্সএআই ‘গ্রক’ সিরিজের এআই মডেল তৈরি করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সময় এক্সএআইয়ের একক মূল্যায়ন ছিল প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার।


একীভূত হওয়ার ফলে এআই, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং বৃহৎ পরিসরের কম্পিউটিং অবকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।


এআই প্রতিযোগিতা এখন শুধু চ্যাটবটের নয়

বিশ্বের এআই প্রতিযোগিতাকে শুধু কোন কোম্পানির চ্যাটবট বেশি জনপ্রিয়—এই প্রশ্ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় একটি শিল্পব্যবস্থা।


একদিকে এনভিডিয়ার মতো কোম্পানি এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিপ সরবরাহ করছে। অন্যদিকে টিএসএমসি সেসব চিপ তৈরি করছে। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও ওরাকলের মতো কোম্পানি বিপুল কম্পিউটিং অবকাঠামো পরিচালনা করছে। আর ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, এক্সএআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেই অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে।


ফলে এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এটি কেবল সফটওয়্যার বা চ্যাটবটের প্রতিযোগিতা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে সেমিকন্ডাক্টর, বিদ্যুৎ, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং, সফটওয়্যার এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার বিশাল অর্থনীতি।


এই কারণেই এআই শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি নীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।