এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। শেখা, তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে জটিল কাজ সম্পন্ন করা-সবখানেই বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। কিন্তু মানুষের কাজ সহজ করার পাশাপাশি এই প্রযুক্তিই এখন চাকরির নিরাপত্তা, মজুরি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।


এআইয়ের দ্রুত বিস্তার কর্মসংস্থানে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে, কর্মীরা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় মজুরি বৃদ্ধির দাবি কমিয়ে দেবেন কি না এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা চাপ তৈরি হতে পারে-এসব প্রশ্ন এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।


সম্প্রতি এশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা এবং সাংহাইয়ের বান্ড সামিটে এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ থেকে শুরু করে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং-নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় উঠে এসেছে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি। 


বিশেষ করে, এআই কীভাবে শ্রমবাজারের প্রচলিত হিসাব বদলে দিতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ।


যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ডোনাল্ড কোহনের মতে, এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা কর্মীদের মজুরি নিয়ে দর-কষাকষিতে প্রভাব ফেলতে পারে। চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন কর্মীরা হয়তো আগের মতো মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানাতে সাহস করবেন না। অর্থাৎ, অর্থনীতিতে চাহিদা ও কর্মসংস্থান শক্তিশালী থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তৈরি অনিশ্চয়তা মজুরি বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে।


সাংহাইয়ে বান্ড সামিটের পাশে সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোহন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি শক্তিশালী এবং চাহিদাও যথেষ্ট থাকলেও নামমাত্র ও প্রকৃত-দুই ধরনের মজুরিই কমেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, এআইয়ের প্রভাব শুধু কর্মীদের কাজের ধরনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বদলে দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা এবং কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে নীতিনির্ধারকদের।


এআইয়ের প্রভাব নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, এই প্রযুক্তি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি মুদ্রানীতির প্রচলিত ধারণাতেও পরিবর্তন আনতে পারে। 


ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ এআইকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি মুদ্রানীতির কাঠামো মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এআইয়ের ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়লে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে নিজেদের নীতিগত অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।


এআই নিয়ে নীতিগত প্রস্তুতি নিচ্ছে চীনও। বেইজিংয়ে ফাইন্যানশিয়াল স্ট্রিট ফোরামে দেওয়া বক্তব্যের শেষ অংশে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং এআইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থনীতিতে এই প্রযুক্তির প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে, এআই শিল্পে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হবে এবং আর্থিক খাতে এর ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে। অর্থাৎ, এআইকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখছে চীন।


তবে এআইয়ের প্রভাব শুধু কর্মসংস্থান বা উৎপাদনশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও চাহিদা কমে গেলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিও চাপে পড়তে পারে। আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র বলেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে চীন পর্যন্ত এশিয়ার অনেক অর্থনীতি এআই খাতের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এআইয়ের চাহিদা কমে গেলে এসব দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


বিশেষ করে, এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ, উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রযুক্তি খাতে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এ কারণে সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছেন জৈন-চন্দ্র। তার মতে, নীতিনির্ধারকদের এখনই আর্থিক ও বৈদেশিক খাতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে পরিস্থিতির অবনতি হলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকে।


অন্যদিকে, এআই খাতে বড় বিনিয়োগকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে গেলে কিংবা শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোসেন বলেন, এআই খাতে বিনিয়োগ ও মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার তুলনায় স্থিতিশীল রয়েছে।


তার ধারণা, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে দরপতন হলেও তার প্রভাব ১৯৮৭ বা ২০০০ সালের মতো শেয়ারবাজারে বড় সংশোধনের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে মুনাফা প্রযুক্তি খাতের কাছাকাছি অন্য শিল্পে স্থানান্তরিত হতে পারে এবং বাস্তব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির গভীরতা ও অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর।


এআইয়ের দ্রুত বিস্তার একদিকে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে চাকরির নিরাপত্তা, মজুরি, বিনিয়োগ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে। প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, এআইয়ের পরিবর্তন শুধু মানুষ কীভাবে কাজ করবে, তা-ই বদলাবে না; বরং কাজের বাজার, মজুরি নির্ধারণ এবং অর্থনীতিকে পরিচালনার প্রচলিত পদ্ধতিকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।