বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সম্ভাবনা ও আশার সঞ্চার হলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্বেগের কারণ রয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। টিআইবি বলছে, এই ১০০ দিনের মধ্যে গত মার্চ ও এপ্রিলেই ৬০৫ জন খুন হয়েছে। ধর্ষণ-চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধ অব্যাহত রয়েছে। মেয়াদ শেষের আগেই ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।


রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন : সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ও বিভিন্ন মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। 


এসময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল, যা হবে সুশাসিত, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই লক্ষ্য অর্জনে আরো দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। 


তিনি বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় লোকজনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।


ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার বিষয়ে দুদকের ভূমিকা রাখা উচিত। কেউ-ই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। 


দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থান নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশন থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাসেও কমিশন গঠন না হওয়া খুবই দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর। কমিশনের এখতিয়ার সচিবকে দেওয়া প্রতিহত করতে হবে। দলীয় পরিচয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার তথ্য তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।


সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুন :  সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে হত্যা-অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে বলে দাবি করেছে টিআইবি। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোট ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ২১৪টি। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল তিন হাজার ৪৯৬টি। এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন।


প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে- বিএনপির রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি জোরদারের মতো পদক্ষেপ সরকার প্রধানের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে টিআইবি।


সংস্থাটি মনে করে- সরকারের কিছু পদক্ষেপ ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্য বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা দিলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান। 


পুলিশ, প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ রয়েছে, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী। টিআইবি বলছে, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি দমনের ঘোষণা সত্ত্বেও হাট-বাজার, পরিবহন খাত, বাস ও ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ অব্যাহত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংসতা এবং মুক্তচিন্তাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।


কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা : টিআইবি জানায়, ইতিবাচক দিক থাকলেও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। অধিকাংশ সংসদীয় কমিটি গঠন না হওয়া ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান অস্পষ্ট রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি কিংবা হামের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু নিয়ে কার্যকর আলোচনা বা উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ ছাড়া মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ যাদের মধ্যে ফৌজদারি মামলার আসামি ও ঋণখেলাপিও রয়েছেন-এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।


বিচার বিভাগ :  টিআইবি প্রতিবেদনে বিচারিক কার্যক্রম অংশে বলা হয়েছে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম গতিশীল করতে আইসিটির প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ, মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান ও ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা, সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ডের দশ বছর পর মামলায় অগ্রগতি হয়েছে। 


রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা করা, মামলা প্রত্যাহার বা জামিন দেওয়ার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। ভিন্নমতের মানুষের বিচারে পুরনো সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে সরকারি দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সাংবাদিকসহ ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের এবং বারবার জামিন স্থগিত করা হচ্ছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, মুনিয়া ও ত্বকী হত্যার বিচারে জনমনে প্রত্যাশার সৃষ্টি হলেও এসব মামলায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে হতাশা দেখা দিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে টিআইবি।


সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন ও রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা।  উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।