মাত্র ছয় দিন পর আগামী বৃহস্পতিবার ভোট নিয়ে অনেক কথা, অনেক অপতথ্য ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার বলছে, একটি উৎসবমুখর, ইতিহাসসেরা স্মরণীয় নির্বাচন হবে। কিন্তু কেন জানি রাজনৈতিক দলগুলো এতে আস্থা রাখতে পারছে না। কেউ বলছে মেটিকুলাস নির্বাচন হবে, আবার কেউ ধারণা করছে অন্য কিছুও হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে যেমন কোন দল কত আসন পাবে, সেটা আগে ঠিক হয়েছে, তারপর নির্বাচন হয়েছে। এবারও তেমন কিছু হয় কি না! কারণ ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়তে পারে। তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন। ভিসা পেতে অনেক উপদেষ্টা আগেভাগেই কূটনৈতিক পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন বলে তিনি জাতিকে জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, এবার ভোট গণনায় বেশি সময় লাগতে পারে। রোগের উপসর্গগুলো আস্তে আস্তে প্রকাশ পাচ্ছে। যারা ভালো চিকিৎসক, তাদের পক্ষে উপসর্গ দেখেই চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। আর যারা সহজে রোগ ধরতে পারেন না তারা বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করার পর চিকিৎসা করেন। সুতরাং নির্বাচনে কী হতে পারে তা নিয়ে যেহেতু নানান কানাঘুষা চলছে, সে কারণে প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট পাহারা দিতে হবে। যে দলের পাহারাদার ভালো হবে, সেই দলই প্রাপ্ত ভোটের সঠিক হিসাব বুঝে নিতে পারবে। আর পাহারাদার যদি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে যা হওয়ার তা-ই হবে। এদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারের সালতামামি শুরু হয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। সরকার আবার নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করছে। সেই চুক্তি কার স্বার্থে হচ্ছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মন্জুরুল ইসলামফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জানতেন তাঁর দলকে ৩০টি আসন দেওয়া হবে। সে কারণেই তিনি প্রথমে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হননি। পরবর্তী সময়ে নানান কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়েছিলেন। নির্বাচনের পর ফলাফল তা-ই হয়েছিল। তখন তিনি এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ তখন তিনি অন্য নানান সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। বাহ্যিকভাবে নির্বাচনটি অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে বলে দেখানো হলেও কুশীলবরা জানেন ঘটনা কী ঘটেছিল। দেশিবিদেশি নানান কুশীলব সেই নির্বাচনের খেলোয়াড় ছিলেন। ওই সময়ে বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। তাঁর মেয়াদ ছিল ১৭-১২-২০০৬ থেকে ০৮-০৭-২০০৯ পর্যন্ত। বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার দায়িত্বটি তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন। এবারের ভোটের আগেই তিনি প্রদত্ত ভোটের হার কত হবে তা বলে দিয়েছেন। ১ ফেব্রুয়ারি ’২৬ রাজধানীর একটি হোটেলে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আমার মনে হয় এবার এর চেয়ে বেশি ভোট পড়বে।’ তাঁর এ বক্তব্য অনেকটা প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা। সে কারণেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যিনি ভোটের আগে সম্ভাব্য প্রদত্ত ভোটের অঙ্ক বলতে পারেন, তাঁর বা তাঁদের কাছে হয়তো আরও কোনো অঙ্কের যোগফল করা আছে, যা সময়মতো প্রকাশিত হবে। তৌহিদ হোসেন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, ‘ভিসা পেতে অনেক উপদেষ্টা আগেভাগেই কূটনৈতিক পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন।’ তবে তিনি কিংবা তাঁর স্ত্রী কেউই এখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট সারেন্ডার করেননি। তাঁর এ বক্তব্যের মধ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে, যা ইতোমধ্যে নানান মহলে আলোচনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে জানার চেষ্টা হচ্ছে কোন কোন উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী তাঁদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন। শুধু কি ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার জন্য, নাকি অন্য কোনো কারণে?
এবার দুটি ভোট একসঙ্গে এবং একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। সে কারণে ভোট গণনা, ব্যবস্থাপনায় অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগবে, এটা স্বাভাবিক। এমন বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো অতীতের চেয়ে আরও বেশি জনবল নিয়োগ করা, যাতে সময়মতো ভোটের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে পরিমাণ লোকবল লাগবে, সে পরিমাণ লোকই নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালন করবে। গণভোট ব্যবস্থাপনার জন্য অতিরিক্ত কোনো লোকবল নিয়োজিত থাকবে না। যেহেতু ভোট একই বাক্সে জমা নেওয়া হবে সেজন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পোস্টাল ব্যালটের জন্য রিটার্নিং অফিসারের অফিসে একটি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এদিকে ২১ জানুয়ারি ’২৬ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিন হওয়ায় এবার ভোট গণনায় দেরি হতে পারে।’ তাঁর এ বক্তব্যকে খুব সহজসরলভাবে গ্রহণ করেনি রাজনৈতিক দল। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩ ফেব্রুয়ারি ’২৬ যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বলেন, ‘ইদানীং নতুন গল্প শুনছি-এবার নাকি ভোট গণনায় অনেক বেশি সময় লাগবে। যদি কেউ ভোট গণনা করতে দেরি হবে এ অসিলায় সুযোগ নিতে চায়, আপনাদের তা প্রতিরোধ করতে হবে। এ দেশের মানুষ এক যুগ ভোট দিতে পারেনি। তবে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা যে তাদের নেই, তা না। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেমন সময় লাগে, দেশের মানুষের সে ধারণা আছে।’ তারেক রহমান দেশবাসী ও দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছেন। নেতা-কর্মীরা যদি সতর্ক থাকেন, তাহলে ভালো। আর নির্বাচনের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে নেতা-কর্মীরা যদি ভোট পাহারা না দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ভাব নিয়ে বসে থাকেন, তাহলে কোন ভোট কোথায় যাবে বলা মুশকিল। কারণ এবারের নির্বাচন সহজ হবে না। এ ছাড়া এক প্রার্থীর ব্যাজ পরে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ঘটনাও ঘটবে।
নির্বাচনের বাকি মাত্র ছয় দিন। যদি ধরে নিই ১২ ফেব্রুয়ারি ’২৬ নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেবে; তাহলে সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই পারে। একটি স্মরণীয় অভ্যুত্থানের পর একটি সরকার শতভাগ সফল হবে, এমনটা প্রত্যাশা করা সঠিক নয়। তার পরও সরকারের ১৭ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে সালতামামি হবে, আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই ২ ফেব্রুয়ারি ’২৬ রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে সরকারের নানান কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যের চেয়ে ঘাটতির পাল্লা ভারী। সংস্থাটি মনে করে, জুলাই আন্দোলন থেকে দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতিবিদরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি। ফলে দেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়নি। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মব সন্ত্রাসের কারণে সহিংসতা বেড়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচনের ‘ভিত্তি স্থাপনের’ যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের, দেড় বছরেও সেসব ‘নাজুক’ অবস্থায়। এ সরকারের ইতিবাচক যে অর্জন হয়েছে, তার তুলনায় ‘ঘাটতি বা পথভ্রষ্ট হওয়ার’ উপাদানের ‘পাল্লাটা তুলনামূলক ভারী’। রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব শুরু করা এ সরকার প্রথম থেকেই সংস্কারকে ‘শুধু সংস্কার’ হিসেবে দেখেছে, বাস্তবায়নের পথে ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করে নিরসনের উপায় অনুসন্ধান করার প্রয়াস দেখা যায়নি। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি আইনগত হোক, সাংবিধানিক হোক বা অন্য মানদণ্ডে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই অবকাঠামোটি দুর্বল।”
ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেরই একজন এবং শুভাকাক্সক্ষী। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় যতটা সম্ভব সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন। সে কারণে তাঁকে ধন্যবাদ। তবে সংস্কারের নামে সরকার যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সময় ক্ষেপণ করেছে, নানানরকম মতলবি আইন ও চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, এর দায় থেকে নিজেকে নিশ্চয় মুক্ত ঘোষণা করবেন না।
৯ ফেব্রুয়ারি ’২৬ অর্থাৎ নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এ চুক্তি অনুষ্ঠান হবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। আগামীকাল ৬ ফেব্রুয়ারি ’২৬ জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (বিজেইপিএ) সই হবে। শেষ সময় এসব চুক্তি নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে বিশেষ করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানান আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনি মাঠে ব্যস্ত, তখন সরকার ব্যস্ত বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে। তাড়াহুড়া করে করা এসব চুক্তি নির্বাচনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে, নাকি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে, তা নিয়ে চলছে নানান আলোচনা। তবে এসব চুক্তি ও আইন যদি হয় ‘চানরাতে’র ব্যবসার মতো, তাহলে জাতিকে এসব নিয়ে দীর্ঘদিন পস্তাতে হবে।