১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপহার দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই তৎপর রয়েছে। এর ফলে মাদকের বিশেষ অভিযান কমে গেছে; এমনকি মাদকের নিয়মিত অভিযানেও ভাটা পড়েছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাগামহীনভাবে ব্যবসা করছে মাদক কারবারিরা। ভারত ও মিয়ানমার থেকে সব ধরনের মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে দেশে। জল, স্থল ও আকাশ সব পথে আসছে মাদক। নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য বলছে, দেশে এখন পর্যন্ত যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে তা দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে আসছে। সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশকৃত মাদক শহর থেকে গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ছে। কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধুদের প্রচর, অসৎ সঙ্গ, নানারকম হতাশা ও আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। পুরুষের পাশাপাশি দিন দিন নারীদের মাঝেও মাদকের প্রবণতা বাড়ছে। সরকারিভাবে মাদকসেবীর সংখ্যা না থাকলেও বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) হিসেবে দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বছরে মাদকের পেছনে খরচ হয় আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষক, ব্যবসায়ী, বাহক ও বিক্রির নেটওয়ার্কে কাজ করে প্রায় ২ লাখ ব্যক্তি। প্রতি বছরই বাড়ছে এ সংখ্যা। বাংলাদেশ থেকে মাদকের কারণে প্রতি বছর পাচার হয়ে যায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিস্তারের এ সর্বনাশা চিত্র যেভাবে আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি করছে, সেভাবে একটি প্রজন্মের চিন্তার জগতে বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করছে। উঠতি বয়সি যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদকের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। জানা গেছে, বাংলাদেশে যত মাদক ঢোকে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ছে। মাদকের লাগাম টানতে ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ডসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করছে। বিজিবির তথ্য মতে, ২০২৫ সালে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১ কোটি ৪৭ লাখ ১৪ হাজার ২৯৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০ কেজি ৪০৮ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ১ রাখ ৩৩ হাজার ৩৯৬ বোতল ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদক জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২ হাজার ৩৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে।


ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে মাদকের বিরুদ্ধে আমরা আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছি। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। মাদক কারবারি যেই হোক তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে।


 মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশে মোট মাদকসেবী প্রায় দেড় কোটি। বর্তমানে মাদকের দিকে কারও নজর নেই। ফলে মাদক মাফিয়া চক্র সুযোগ পেয়ে দেশব্যাপী মাদক ছড়িয়ে দিয়ে রমরমা ব্যবসা করছে। বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নির্বাচনি দায়িত্বের কারণে মাদকবিরোধী কার্যক্রম শিথিল হয়েছে তা সঠিক নয়।


 মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি, টার্গেটেড অভিযান ও আন্তসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে মাদক চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বড় কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন থাকলে অনেকে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ এবং পরিকল্পনা করার কারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেদার মাদকব্যবসা পরিচালনা করছে কারবারিরা।