খুব সহজেই কারবারিদের কাছ থেকে মাদকসেবীর হাতে নিরাপদে পৌঁছে যাচ্ছে সব ধরনের মাদক। ঘরে বসে অনলাইন কিংবা ফোনকলে অর্ডার দিলেই হলো, কোনো হয়রানি ছাড়াই মিলছে মাদক। টাকা লেনদেন হচ্ছে ডার্ক ওয়েব ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। আর ডেলিভারি হয় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। ফলে দেশ বা বিদেশ থেকে আসা সব ধরনের মাদকই নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে নগর থেকে গ্রামে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্ধকারে থাকছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কুরিয়ারে পাঠানো মাদকের এসব চালানের খুব অল্পই ধরা পড়ে। এতে দ্রুতই মাদক ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মাদকসেবীর কাছে। আবার মূলহোতারাও থাকছেন আইনের আওতার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্টদের নজরদারি না থাকায় মাদক চোরাচালানের নিরাপদ ও প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসি সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তাও স্বীকার করেন যে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হয়ে উঠছে। সব ধরনের মাদক পরিবহনে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশিবিদেশি চক্র জড়িত। দেশের অভ্যন্তরীণ ছাড়াও বিদেশে পাচার হচ্ছে মাদক। অনেক সময় মাদকের ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছেন পাচারকারীরা। কুরিয়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টরা জানান, কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে মাদক শনাক্তকরণ মেশিন না থাকায় কোন চালানে কী আছে জানেন না সার্ভিস অপারেটররা। তবে এর সঙ্গে একমত নন ক্রাইম বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, জবাবদিহিতার অভাবে ক্রমেই এটা বেড়ে চলেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযান চালিয়ে আমরা মাদকদ্রব্যও উদ্ধার করছি। সংশ্লিষ্ট দেশিবিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসকে নোটিস দিয়ে সতর্ক করছি। ডাক, কুরিয়ার সার্ভিস ও এক্সপোর্ট কার্গোর মাধ্যমে অবৈধ মাদক পাচার শনাক্ত ও রোধে সংশ্লিষ্টদের বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রেরক ও প্রাপকের ফোন নম্বর ও এনআইডি নিতে জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ অভিযান চালিয়ে আমরা দেখেছি অনেক সময় প্রাপক এবং গ্রাহকের যোগাযোগের সঠিক ঠিকানা দেওয়া থাকে না। ফলে বেশির ভাগ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া পার্সেলগুলো ড্রাগ ডিটেকটিভ মেশিন ও স্ক্যানারে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।’ জানা যায়, সম্প্রতি মাদকবিরোধী এক বিশেষ অভিযানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৬ কেজি সিসা ও ৪১টি হুক্কা জব্দ করে ডিএনসি। এ ঘটনায় যমজ ভাইসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অবৈধভাবে এ নেশাদ্রব্য সারা দেশে সরবরাহ করতেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে সিসা পাঠাতেন। এ ক্ষেত্রে তারা দুটি কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করতেন। তবে ওই দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের নাম বলেননি ডিএনসি কর্মকর্তারা। তাঁরা আরও জানান, এ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৬৪২ কেজি ভয়ংকর ও ক্ষতিকারক মাদক ‘খাট’ জব্দ করা হয়েছে। এটি বৃহত্তর আফ্রিকা বিশেষ করে ইথিওপিয়া থেকে এসেছে। জানা যায়, পাচারকারীরা মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছেন। আফ্রিকার মাদকগুলো তারা ইউরোপের দিকে পাঠিয়ে দেন। এ কাজে দেশিবিদেশি বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করছেন তারা। দেশে জব্দ খাট মাদকের সব চালানই কুরিয়ার সার্ভিসে এসেছিল। অনেক সময় বিদেশি নাগরিকরা এ খাট মাদক বহন করছেন। এ ছাড়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সম্প্রতি ঢাকার উত্তরা থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম ক্ষতিকর মাদক কিটামিন উদ্ধার করেছে ডিএনসি। এ ঘটনায় তিন চীনা নাগরিককে আটক করা হয়। তারা বিশেষ কৌশলে সাউন্ডবক্সের ভিতরে লুকিয়ে এসব মাদক শ্রীলঙ্কা ও চীনে পাচার করছিলেন। একইভাবে একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইতালিতে পাচারের সময় গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ৬ কেজি ৪৪ গ্রাম কিটামিন জব্দ করে ডিএনসি। তারা তোয়ালের ভিতর বিশেষ কায়দায় দ্রবীভূত করে মাদকের এ চালানটি পাঠাচ্ছিল। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়। এ বিষয়ে ডিএনসির উপপরিচালক (অপাশেনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। ডাক, কুরিয়ার সার্ভিস ও এক্সপোর্ট কার্গো-সংশ্লিষ্টদের কর্মপন্থাসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া আছে। সেই নির্দেশনা ঠিকমতো মানছে কি না সেটা নিয়মিত মনিটরিং করায় সফলতা আসছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমরা অভিযোগ পেলেই অভিযান চালাচ্ছি। মাদকদ্রব্য জব্দসহ জড়িতদের আটক করা হচ্ছে।’