রাজধানীর সড়কে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার নজরদারিকে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে বেশ কয়েকটি চক্র। এই প্রতারক চক্রটি যারা আইন ভঙ্গ করেননি তাদের মোবাইল ফোনে মামলার ভুয়া মেসেজ পাঠিয়ে থাকে। ইতিমধ্যে অনেকেই প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে এটিএম কার্ডের তথ্য দিয়ে লাখ টাকাও খুঁইয়েছেন। ক্রমেই বাড়তে থাকা এসব ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। অবশেষে এই প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চক্রের সদস্যরা বিদেশে বসেই ৩ লেয়ারে প্রতারণা করে যাচ্ছে। টাকা হাতিয়ে নিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে দেশীয় এজেন্ট। পরে সেগুলো বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, চীন, কম্বোডিয়া ও হংকংয়ের প্রতারক চক্রের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রতারণার পেছনে আরও অনেক চক্র জড়িত। পর্যায়ক্রমে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মূল প্রতারকদের এজেন্ট হিসেবে যারা টাকা আত্মসাৎ ও পাচারে জড়িত তাদের বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। চীন থেকে সক্রিয় একটি চক্রের ৩ বাংলাদেশি এজেন্টকে গত বুধবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- এটিএম কার্ডের তথ্য নিয়ে বিকাশে এড মানি করার মূল দেশীয় এজেন্ট ইফতেখার হাসান রায়হান এবং তার দুই সহযোগী মো. জাহিদুল ইসলাম ও রিপন। টেলিগ্রাম অ্যাপসে পেমেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজের খোঁজে বিজ্ঞাপন দিলে রায়হানকে খুঁজে নেয় ওই চীনা প্রতারক। আর অপর দুজনকে রায়হান যুক্ত করে। ডিবি সূত্র আরও জানায়, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের তথ্য থেকে বিকাশে এড মানি করে একটি চক্রের সদস্য টাকা আরেক চক্রের কাছে সরবরাহ করে। ওই চক্রের সদস্যরা টাকা পাচার করে। এই এড মানি ও পাচার চক্র কেউ কাউকেই চেনে না। এই দুই লেয়ারের এজেন্ট ঠিক করে বিদেশে থাকা মূল চক্র। আর এড মানি চক্র বিকাশ নম্বর ভাড়া করতে মূল এজেন্টের পরামর্শে যোগ দেয় সহযোগী এজেন্ট।


বিদেশ থেকে যেভাবে প্রতারণার ফাঁদ : ডিবি বলছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও বিআরটিএ-এর সার্ভার হ্যাক হয়ে তথ্য পাচার হয়ে গেছে আগেই। ডার্ক ওয়েবে সেসব তথ্য প্যাকেজ হিসেবে বিক্রিও হয়েছে। তখন বিভিন্ন দেশের প্রতারকরা ওই তথ্য কিনে নেয়। সেই তথ্যই এখন প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এআই মামলার প্রতারণার ক্ষেত্রে, শুরুতে বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইট ক্লোন করে একই রকম একটি ওয়েবসাইট বানানো হয়। মামলার মেসেজ পাঠানো ব্যক্তি যখন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, সেখানে পেমেন্ট অপশনে, নাম, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের নম্বর, কার্ডের ভ্যালিডিটি ও সিভিভি (৩ অঙ্কের নিরাপত্তা কোড) নম্বর দিতে বলা হয়। মূলতো ফিশিং ওই ওয়েবসাইটে গেলেই ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তির মোবাইলের কন্ট্রোল চলে যায় প্রতারকের হাতে। কার্ডের তথ্য দেওয়ার পর প্রতারক মোবাইলে আসা ওটিপি নম্বরও দেখতে পারেন। তখন ওই কার্ডের তথ্য ও ওটিপি তাৎক্ষণিক পাঠিয়ে দেন বিকাশে এড মানি করতে বাংলাদেশে ভাড়া করা এজেন্টের কাছে। মুহূর্তের মধ্যে অ্যাকাউন্ট থেকে যত পরিমাণ সম্ভব টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর আরেক চক্রের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা বিদেশে নেওয়া হয়।


লাখ টাকাও খুঁইয়েছেন অনেকে : গত ২৫ মে জিয়ারত ইসলাম নামে এক ডাক্তারের মোবাইল ফোনে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের মেসেজ আসে ওভার স্পিডের কারণে তার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সড়ক ট্রাফিক আইনের ১৪ ও ২৩ ধারার সবশেষ সংশোধনী অনুযায়ী জরিমানা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না করা হলে এবং কোনো আপিল দায়ের করা না হলে, তা বকেয়া হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ফলে প্রতিদিন ৫-১০% হারে বিলম্ব ফি যুক্ত করা হবে। বকেয়া ৩০ দিনের বেশি হলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে জরিমানা, বিলম্ব ফি ও মামলা পরিচালনা খরচসহ মামলা স্থানীয় আদালতে দাখিল করা হবে। এই আইন লঙ্ঘনের রেকর্ডের কারণে বার্ষিক পরিদর্শন, মালিকানা হস্তান্তর ও নিবন্ধন বাতিল করা যাবে। মেসেজটিতেই তাকে বিআরটিএর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের আদলে বানানো ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়। ওই ওয়েবসাইটে ঢুকে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিলে মুহূর্তের মধ্যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে দুই বাংলাদেশি নম্বরে ১ লাখ টাকা ট্রান্সফার করে নেওয়া হয়। শুধু জিয়ারত ইসলামই নয়- সড়কে এআই মামলা শুরুর পর এমন প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন অনেকেই। ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার (এসি) খান মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রতারকরা নতুন কোনো ডিজিটাল সেবা দেখলে সেটিকে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পাতছে। এটি থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই।