বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পাশ দিয়ে পদ্মা নদী বয়ে গেলেও রাজশাহীতে চলছে খাবার পানির সংকট। কোথাও নলকূপে পানি উঠছে না, কোথাও সেচের গভীর নলকূপও অচল হয়ে পড়ছে। ফলে পদ্মার পারের রাজশাহীতে পানিসংকট এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; হয়ে উঠছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট। অন্যদিকে রংপুর অঞ্চলে এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আমনের খেতগুলো পানির জন্য হাহাকার করছে। রংপুর অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজ রহমান জানান, চলতি আগস্টে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১০০ মিলিমিটারের মতো। এ অবস্থায় আমন চাষিদের ভূগর্ভের পানি কিনতে বাড়তি খরচ হচ্ছে।


রাজশাহী ওয়াসার তথ্য বলছে, মহানগরীর পানি সরবরাহব্যবস্থা এখনো বড় অংশে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। ওয়াসার ওয়েবসাইটে দৈনিক পানির চাহিদা ১১৩.২৯ মিলিয়ন এবং উৎপাদন ৯৫ মিলিয়ন লিটার উল্লেখ করা হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার আওতায় আছে প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ। একই সঙ্গে ওয়াসা বলছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও হার্ডনেস তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ভবিষ্যতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে সরবরাহের দিকে যেতে তারা কাজ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, নদী গবেষক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘রাজশাহীর পানিসংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। মহানগরীর পাশেই পদ্মা, কিন্তু নগরবাসীর পানির বড় অংশ আসে মাটির নিচ থেকে। অর্থাৎ নদীর বিশাল জলভান্ডার পাশে রেখেও পানি সরবরাহব্যবস্থার মূলভিত্তি হয়ে আছে ভূগর্ভস্থ পানি। এর পেছনে আছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। পদ্মার পানি সরাসরি মানুষের ঘরে দেওয়া সম্ভব নয়। নদীর পানি সংগ্রহ, শোধন, জীবাণুমুক্তকরণ, সংরক্ষণ এবং বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরবরাহ করতে হয়। এজন্য দীর্ঘদিন পদ্মার পানি শোধন করে নগরবাসীকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়েছে।’ ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে রাজশাহী ওয়াসা জানিয়েছিল, দৈনিক প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৯০ লাখ লিটার এবং উৎপাদিত পানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসত ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। একই সময়ে পদ্মার পানি শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘মহানগরীর বাইরে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গোদাগাড়ী, তানোরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নেমে যাচ্ছে। গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় দেখা গেছে, গোদাগাড়ী, তানোর ও নওগাঁর নিয়ামতপুরে প্রতি মাসে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ০.০০৪ থেকে ০.০২৮ হারে নিম্নমুখী হচ্ছে; যা পুনর্ভরণের তুলনায় বেশি পানি উত্তোলনের ইঙ্গিত দেয়।’


গবেষকদের মতে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে পানির সংকট সরাসরি যুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে ধানসহ সেচনির্ভর ফসল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হয়। বছরের পর বছর এভাবে পানি উত্তোলন করা হলেও সে অনুপাতে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে ফেরত যাচ্ছে না। ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, দক্ষ সেচব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিতে হবে।’


এদিকে চলতি আগস্টে রংপুরে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ৪০০ মিলিমিটারের ওপর। অথচ আগস্টের ২২ তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১০০ মিলিমিটার। ফলে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল আমনের খেতগুলো পানির জন্য হাহাকার করছে। এ অবস্থায় আমন ধান রক্ষা করতে কৃষক জমিতে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করে সেচ দিচ্ছেন। এতে একরপ্রতি সেচ দিতে তাঁদের খরচ হচ্ছে ৮ হাজার টাকার ওপর। এ বিভাগে এবার প্রায় ১১ লাখ হেক্টরে আমনের চাষ হয়েছে। রংপুর মহানগরের খাসবাগ এলাকার আমন চাষি আসাদুজ্জামান আফজাল বলেন, ‘বর্তমানে আমন ধানের বয়স দুই থেকে আড়াই মাস। এ পর্যন্ত চারবার সেচ দেওয়া হয়েছে। প্রতি দোন (২৪ শতক) জমিতে প্রতি ঘণ্টায় সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকা। এ পর্যন্ত চারবারে ২২-২৫ ঘণ্টা সেচ দেওয়া হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকার ওপর।