বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। এ দেশের মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। নাগরিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলবে রাষ্ট্র। জনগণ যাকে পছন্দ করবে তাকে দেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব। তারা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। এটাই সংবিধানের কথা। কিন্তু পুস্তকে লিপিবদ্ধ এসব চমৎকার কথা কি বাস্তবে আদৌ মানা হয়? জনগণের কথা, তাদের দুঃখ-বেদনা আর হতাশার কথা কি কেউ শোনে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যা হচ্ছে, তা দেখেশুনে এ প্রশ্নটি সামনে এলো। এক মাসের বেশি চলছে গ্যাসের জন্য হাহাকার। বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের। কেউ মধ্যযুগে ফিরে গেছে। মাটির চুলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে কোনোরকমে রান্নার কাজ সারছে। যারা সিলিন্ডারের এলপিজি ব্যবহার করে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এলপিজি সিলিন্ডার যেন সোনার হরিণ! বাজারে বেশির ভাগ দোকানেই নেই এলপিজি সিলিন্ডার। যেখানে আছে, সেখানেও দাম চাওয়া হচ্ছে অনেক বেশি। তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ এখন মাটির চুলাকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। সরকার নীরব, নির্বিকার! তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একটি দায়সারা বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করেছে। জ্বালানি উপদেষ্টা সব সময় সরব থাকেন কিন্তু এবার তিনি এ বিষয়ে মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন। দেশের মানুষ যখন গ্যাস সংকটে অসহায়, তখন তিনি উত্তরের জনপদে জনগণকে আগামী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে ব্যস্ত। মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে ভাবার সময় নেই তাঁর। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সবাই প্রতিদিন নানান বিষয়ে কত কথা বলেন। তাঁদের হিতোপদেশ শুনে আমরা সাধারণ মানুষ বিমোহিত হই, কিন্তু আমাদের বাঁচা-মরার সমস্যার সমাধান কোথায়, কার কাছে? কে আমাদের জানাবে কবে গ্যাসের পরিস্থিতি ঠিক হবে। কবে আমদের জীবনে একটু স্বস্তি আসবে?
জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে আর কথা বলতে চায় না নিরীহ মানুষ। তারা জানে এসব বলে কোনো লাভ নেই। সম্প্রতি চালের দাম নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। রাজধানীর বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম আবার বেড়েছে। কয়েক দিন পর বাজারে নতুন চাল আসবে। তার আগেই পুরোনো চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে অস্বস্তিতে পড়েছে নিম্ন আয়ের ভোক্তারা। সপ্তাহের ব্যবধানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত। ধরনভেদে দেশি নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে, যা সপ্তাহখানেক আগে ৩ থেকে ৪ টাকা কম ছিল। আর আমদানি করা নাজিরশাইলের দাম কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা হয়েছে।
বছরের এই সময়ে আউশ, আমন ও নাজিরশাইল চাল বাজারে আসার কথা। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণত প্রতি বছর এসব চাল বাজারে আসার পরে পুরোনো চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বাড়ে। কিন্তু এবার নতুন চাল বাজারে আসার আগেই পুরোনো চালের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে।
বাংলাদেশে চাল হলো প্রধান খাদ্যপণ্য। চালের দামের ওপর নির্ভর করে গোটা বাজার। চালের বাজারের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বাজারজুড়ে। মানুষ অসহায়, তারা কী করবে? আমাদের খাদ্য উপদেষ্টাকে দেখা যায় কালেভদ্রে। যিনি যতটা না উপদেষ্টা, তার চেয়ে বেশি আমলা। জনগণের সঙ্গে তাঁর দেয়ালটা তাই চীনের প্রাচীরের মতোই উঁচু। এ দেয়াল ডিঙিয়ে তাঁর কথা যেমন আমরা জনগণ শুনতে পাই না, তিনিও আমাদের কষ্ট বোঝেন না। কাজেই মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষের অসহায়ত্ব তাঁকে উদ্বিগ্ন করবে কীভাবে?
ওষুধ এখন আমাদের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমন ভাগ্যবান পরিবার খুব কমই আছে যাদের মাসিক বাজেটে ওষুধের হিসাব নেই। সেই ওষুধের বাজারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। সম্প্রতি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বড় করছে সরকার। এ তালিকায় এখন ওষুধের সংখ্যা ১৩৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৫। এসব ওষুধ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? সরকারের নির্দেশনার কোনো প্রভাব নেই বাজারে। ওষুধের দামে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে আগের মতোই। আমাদের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ইদানীং আমজনতার কাছে দৃশ্যমান হন না। তিনি যেন দূর দ্বীপবাসিনী। তাঁর ডেপুটি সব কথা বলেন। তিনিই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বড় করার ঘোষণা দেন।
সরকারের কাজ যেন সচিবালয়ে বসে ঘোষণা দেওয়া! এই ঘোষণা বাস্তবায়ন হলো কি না তা দেখার জন্য কেউ নেই। আইন অনুযায়ী এটা দেখার কথা ঔষধ প্রশাসনের। কিন্তু ঔষধ প্রশাসনের কাছে এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলেই তারা ভাঙা রেকর্ড বাজায়-লোকবলের অভাব। জনগণ সেই অজুহাতের খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে।
একদিকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে চরম নিরাপত্তাহীনতা সর্বত্র। এ দেশে এখন কেউ নিরাপদ নয়। মব সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি আমরা। পাড়ায় মহল্লায় চলছে নীরব চাঁদাবাজি। ছোটখাটো দোকানপাট থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান-কেউই চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। চাঁদা না দিলেই শুরু হয় মব সন্ত্রাস অথবা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ভিতরে ঢুকে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পর আমরা কর্তাদের হাঁকডাক শুনি। তদন্তের তোড়জোড় লক্ষ করি কিছুদিন। তারপর সবকিছু থিতিয়ে যায় চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো। জনগণ কোথায় যাবে? কার কাছে পাবে ন্যায়বিচার?
দেশে একটি নির্বাচন আসন্ন। ২২ জানুয়ারি শুরু হবে নির্বাচনি প্রচার। সব দলের প্রার্থী অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলবেন। জনগণের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি আমরা শুনব, আমরা শুনব উন্নয়নের ফুলঝুরির গল্প। কিন্তু আমাদের অসহায়ত্ব দূর হবে কবে? কবে সাধারণ মানুষ মনে করবে, এই দেশটা আমাদের। আমরাই এই রাষ্ট্রের মালিক।