নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস পর, যখন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন ও সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন দেশের রাজনৈতিক ধারা আবারও সংঘাতের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে হচ্ছে।
বিরোধী দলের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য, জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বাগযুদ্ধ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো গঠনমূলক গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার চেয়ে রাজনৈতিক বয়ান, অবস্থান প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই প্রবণতারই প্রতিফলন। গত কয়েক মাসে তারা একাধিকবার দাবি করেছেন যে, সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক বৈধতা নেই। আরও অভিযোগ করেছেন যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে রাজনৈতিককরণের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি, সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করলে তাঁর দল নীরব থাকবে না বলেও সতর্ক করেছেন।
এ ধরনের সমালোচনা সংসদীয় গণতন্ত্রে অস্বাভাবিক বা অনুপযুক্ত নয়। বরং বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখা।
তবে গণতন্ত্র শুধু সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হওয়া উচিত সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্রে সংলাপ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান পথ। এমন ধারাবাহিক আন্দোলন বা মেরুকরণ কাম্য নয়, যা দেশকে আবারও রাজপথের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা যায় যে দীর্ঘদিনের রাজপথকেন্দ্রিক রাজনীতি সবসময় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সামাজিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে তোলে।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। ভোটাররা বিরামহীন আন্দোলন-সংগ্রামের পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক সংসদীয় রাজনীতির পথকে বেছে নিয়েছেন। সেই সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সন্তুষ্ট হোক বা না হোক, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তারা পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি বিদ্যমান সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। লাগাতার অস্থিরতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।
এই নীতিটি সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দল জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত উত্তরাধিকার কারা বহন করছে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। অথচ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কার্যকর নীতিগত বিতর্ক উপস্থাপনের বদলে রাজনৈতিক শক্তি ও মনোযোগ ক্রমেই প্রতীকী লড়াই, জনসমাবেশ এবং শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে ব্যয় হচ্ছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একই পরিসরে অবস্থান করলেও তারা নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় করতে পারছে না বলেই মনে হচ্ছে। যারা গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলে, তারা যদি নিজেদের মধ্যেই পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে না পারে, তবে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের প্রতি তাদের অঙ্গীকার কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাকে ষড়যন্ত্রের দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা প্রমাণ করে যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও তথ্যের চেয়ে সন্দেহ এবং যুক্তির চেয়ে অবিশ্বাসের প্রভাব বেশি।
বক্তব্য ও বাস্তবতার এই ফারাকই হয়তো সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। জামায়াতে ইসলামী নিজেকে নৈতিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি বিতর্ক সেই দাবির যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। অসদাচরণের অভিযোগ, সাংবাদিক নির্যাতন, স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক দলটির ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
যদিও কিছু ঘটনায় দলটি তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তবুও এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার পরীক্ষায় কোনো রাজনৈতিক দলই ছাড় পায় না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও একই সংকেত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস সহিংসতায় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রশাসন, শিক্ষক ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও তদন্তের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের স্বার্থের প্রশ্ন আড়ালে পড়ে গেছে; সামনে এসেছে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আগ্রাসী রাজনৈতিক আচরণের অভিযোগ। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক, ঘটনাটি একটি মৌলিক শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়— সংলাপের পরিবর্তে যখন শক্তি প্রদর্শন রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন ছাত্ররাজনীতি তার নৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে।
বাংলাদেশ এর আগেও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ছাত্রসংগঠনগুলো প্রায়ই সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি নিয়ে পথচলা শুরু করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণের অংশ হয়ে পড়ে।
সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কে ইতিহাস এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা দেশের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা, বিচারিক কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের তৎকালীন নেতৃত্বের একটি অংশ এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। এসব বর্ণনায় আল-বদরের মতো সহায়ক বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত নৃশংসতার অভিযোগও রয়েছে।
জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক বয়ানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এবং সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার এখনও দলটিকে ঘিরে জনমত ও রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলছে।
ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই কোনো রাজনৈতিক দলের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। শুধু অতীতের ভিত্তিতে কাউকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাখ্যান বা নিঃশর্ত গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাদের বর্তমান আচরণ ও অবস্থানের ভিত্তিতে।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা, সহিংসতার প্রত্যাখ্যান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি—এসবই গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক মানদণ্ড। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই এখনও আত্মতুষ্ট হওয়ার অবস্থানে নেই।
এই মূহুর্তে কে বেশি বঞ্চিত বা নিপীড়িত—তা নিয়ে প্রতিযোগিতা, কিংবা ক্রমেই উসকানিমূলক হয়ে ওঠা রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষের বড় চিন্তা এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করা নিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতে ব্যয় হওয়া প্রতিটি মুহূর্ত দেশের জরুরি সমস্যাগুলোর সমাধানকে আরও বিলম্বিত করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজপথকেন্দ্রিক সংঘাতের রাজনীতি থেকে সংসদভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে উত্তরণের প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এই রূপান্তরের সাফল্য শুধু সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে দেশ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। এর জন্য বিরোধী দলগুলোরও সংযম দেখানো, বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত বিকল্প উপস্থাপন করা এবং অব্যাহত আন্দোলনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া জরুরি।
রাজনৈতিক বৈধতা স্লোগানের উচ্চতা বা জনসমাবেশের আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর ভিত্তি হলো দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের আস্থা। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে এসে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করা। এই দায়িত্ব সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই।