জুলাইয়ের আন্দোলন যদি ব্যর্থ হতো তাহলে ওই আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা কাউকেই বাংলাদেশের মাটিতে নিঃশ্বাস নিতে দেওয়া হতো না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় আমরা খুন, গুম আর আয়নাঘরের মতো বাস্তবতা দেখেছি। আন্দোলন যদি সফল না হতো তাহলে আমাদের আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো।’
জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চেয়েছিলেন-প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে দেশটা একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় থাকবে সেটুকু দেখতে চেয়েছি। এটা শুধু রাজনীতিতে নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকবে। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে আমরা সহাবস্থানে থাকব। আমাদের তরুণ সমাজ তাদের মেধা ও মনন দিয়ে দেশটা নিয়ে ভাববে, চিন্তা করবে। আর আমাদের কাজ হবে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তরুণদের পাশে থাকা।’
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘যেকোনো একটা গণ অভ্যুত্থানের পর সামনে থাকা অনেকেই পেছনে চলে যান। আবার অনেকেরই পাওয়া-না পাওয়ার আক্ষেপ থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যেমন একটা সময় একটা দল দখল করার চেষ্টা করেছে, অথচ মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের, শ্রমিকের। তেমনই আমাদের জুলাইও কিন্তু তা-ই ছিল। শুরুতে নেতৃত্বে ছাত্ররা ছিল। কিন্তু তার পেছনে দলমতনির্বিশেষে সব মানুষ ছিল। এখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু মানুষ এটাকে একটা দলের করতে চেষ্টা করছে। কিছু দল জুলাই আন্দোলনকে তাদের বলে দাবি করছে। কিছু দল, কিছু মানুষ, কিছু গোষ্ঠী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জুলাইকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে।’
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদের পতন। সেটা হয়েছে। এরপর অনেকের আকাক্সক্ষা অনেক রকম হয়েছে। যেমন ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রথমে বিচারের অপেক্ষায় আছি। বিশ্বাস করেন আমি কারও প্রতি একচুল অন্যায় হোক, অবিচার হোক চাই না। কিন্তু যার যেটা ন্যায্য বিচার সেটা পাইনি। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমি আশা করব যে প্রক্রিয়াটা অতিদ্রুত হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু বিলম্বিত বিচারব্যবস্থায়ও মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হয়। চব্বিশের আন্দোলনে অংশ নিয়ে যে ছেলেটা এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, যার মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা অন্ধত্ববরণ করল তাদের আমরা কী জবাব দেব। এজন্যই বলছি বিচারটা হওয়া জরুরি। পাশাপাশি আন্দোলনে অংশ নিয়ে যারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করেছেন তাদের পুনর্বাসন হওয়া জরুরি। সেটা না করে আহতদের পরিবারের মর্যাদাটা একটা ক্যালেন্ডারের পাতায় রেখে তা উদ্যাপনে আমার আপত্তি রয়েছে।’ জুলাই-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে কিন্তু আমি এখনো ধোঁয়াশার ভিতরে আছি। আমাদের শিক্ষানীতিতে গণতান্ত্রিক আদর্শ কীভাবে ধারণ করবে সেটা কিন্তু এখনো আমাদের কারও কাছে পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত এতবার শিক্ষানীতি কেন পরিবর্তন করতে হলো? ভবিষ্যতে এটা কারা করবে? একটা জাতিকে ধ্বংস করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করতে হয়। এখন আমাদের এখানে শিক্ষাব্যবস্থাটা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সরকার যদি পরিষ্কার করত তাহলে হয়তো আমি বলতাম যে হ্যাঁ, আকাক্সক্ষাটা বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কী পরিকল্পনা তা যদি জানা সম্ভব হতো তাহলে বুঝতাম আন্দোলনের পরে আমরা আকাক্সক্ষা পূরণের পথে হাঁটছি। পাশাপাশি আমাদের দেশের নারীরা নিরাপদ নন। আগেও ছিলেন না। এখন আরও অনেক বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এটা তো দেখবার কথা ছিল না আমাদের।’
আন্দোলনে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বলতে গিয়ে সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে দেশের কোন মানুষটা সম্পৃক্ত হয়নি? প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সবাই তো জুলাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আন্দোলনটা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে হয়েছে তাই ছাত্রছাত্রীদের ঘিরে তো শিক্ষক হিসেবে আমাদেরই প্রথম সারিতে থাকার কথা। সেভাবেই দেশের মানুষ হিসেবে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছি।’