মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। গতকাল সকালে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দুই শীর্ষ নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ অনুরোধ জানান তারেক রহমান। বৈঠকে সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারকসহ সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়। দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একমত হন দুই সরকারপ্রধান। রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান সকালে ‘পরদানা পুত্রা’য় পৌঁছালে তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনারসহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে দুপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর দুই শীর্ষ নেতার অংশগ্রহণে যৌথ এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়।’ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। পরে তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বক্তব্য দেন। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে দেন আনোয়ার ইব্রাহিম। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় এবং সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।


বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি মোহাম্মদ হাসান, মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব দাতো শাহরোল আনুয়ার বিন সারমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল তান শ্রী আমরান মোহাম্মদ জিন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে শুভেচ্ছাবার্তাগুলোর একটি পেয়েছিলাম, তা ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।’ তিনি বলেন, ‘তাঁর সেই আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে আমি সম্মানিতবোধ করছি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফরে আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’


পিতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমি আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করছি। তাঁর সেই সফর আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করে।’ তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার। পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।  মালয়েশিয়ায় তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং আতিথেয়তা জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, মালয়েশিয়া সরকার ও জনগণের প্রতি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আজ এক মধুর স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরছি।’


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেছি। আজ আমরা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ প্রক্রিয়াসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছি এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বৈঠকে সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারকসহ সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় হওয়ায় স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব উদ্যোগ আমাদের সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং সম্পর্কের ইতিবাচক গতিধারা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমরা যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’


এ বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করা হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দলিল দুটি বিনিময় করেন।  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী জনসমর্থন পেয়েছে। জনগণের বিপুল সমর্থনের ভিত্তিতে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি।’ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আলোচনা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালালশিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজন খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ আসিয়ানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে আমরা আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ যোগদানে আগ্রহী। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযুক্তি প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’


তারেক রহমান বলেন, ‘বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। আমরা জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানাই। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশাবাদী।’


মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বাংলাদেশের জনগণ তাঁদের স্বাগত জানাতে গর্ববোধ করবে।’


প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্য : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে তিনি তাঁর প্রথম সরকারি সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর এ সদিচ্ছাকে আমরা গভীরভাবে সাধুবাদ জানাই। এটি আপনাদের গভীর ভালোবাসা ও আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। আমরা সৌভাগ্যবান যে আপনার প্রয়াত বাবা ও মায়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। আমি তাঁকে (তারেক রহমানকে) আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছি যখন আমি একজন যুবনেতা হিসেবে মৌচাক ক্যাম্পে তাঁর বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম।’ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার প্রয়াত মায়ের সঙ্গেও বেশ কয়েকবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমার দেখা হয়েছিল। এর চেয়েও বড় কথা হলো, ভাই তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবার চরম কষ্ট ও সংগ্রাম সহ্য করেছেন। তিনি নিজের দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং তাঁদের স্বাধীনতা ও উন্নতির পক্ষে নিজের আদর্শে সব সময় অবিচল থেকেছেন।’


আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘মানবসম্পদ সহযোগিতা বিশেষ করে আমাদের শ্রমিকরা, প্রথমত আমাদের অর্থনীতিকে টিকে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এই খাতটি নিয়ে অনেক বিতর্ক ও উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক দিক, শ্রমিকদের সঙ্গে আচরণ এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করার চ্যালেঞ্জ এর মধ্যে অন্যতম। আমি তার স্পষ্টবাদিতা এবং আমাদের যৌথ লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে সাধুবাদ জানাই। হ্যাঁ, আমাদের শ্রমিকের প্রয়োজন আছে। তবে তার চেয়েও বড় কথা হলো আমাদের অবশ্যই শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণ রক্ষা করতে হবে।’


মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ ও নিপীড়নের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমিকদের শোষণ, তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং কেবল নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করার এই চলমান প্রবণতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ব্যক্তিগতভাবে এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি যে মনোভাব প্রকাশ করেছেন, আমি তার গভীরভাবে প্রশংসা করি। এই বাড়াবাড়ি বন্ধে এবং প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয় তা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই নেতৃত্ব দিতে হবে। এটি যেন উভয় দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করে।’


২০২৭ সালের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া : ২০২৭ সালের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। পাশাপাশি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদান এবং আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জোরদারে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের হালাল শিল্পের উন্নয়নে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে দেশটি। গতকাল পুত্রজায়ায় সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।


আসিয়ান-আরসিইপির সঙ্গে সম্পৃক্ততায় সমর্থন : গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে যোগদানে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটি জানায়, ভবিষ্যতে আরসিইপিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে।


শ্রমবাজার নিয়ে নতুন চুক্তিতে সম্মতি : বৈঠকে দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে শ্রমিক নেওয়া অব্যাহত রাখার বিষয়টি। বিদ্যমান শ্রমশক্তি অভিবাসন সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করে বর্তমান বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুসারে একটি নতুন, হালনাগাদ কাঠামো তৈরির জন্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। নির্ভরযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।


প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার : দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রশংসা করে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক পুরোপুরি কার্যকর করার অঙ্গীকার করেন উভয় নেতা। সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হন। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য একটি কাঠামোগত রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি (জেসিডিসি) বৈঠক আয়োজনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তারা।


হালাল শিল্পে সহযোগিতা : দুই নেতা বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্বের স্বীকৃতি দেন এবং বাংলাদেশের হালাল শিল্প খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারে একমত হন। তারা মালয়েশিয়ার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট বিভাগ (জাকিম) ও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চলমান সহযোগিতাকে স্বাগত জানান এবং হালাল সনদ প্রদান, নিয়ন্ত্রক কাঠামো, গবেষণা, উদ্ভাবন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন।


জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ : জ্বালানি খাতে সহযোগিতাও আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল। উভয়পক্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য বিষয়ক বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানায় বাংলাদেশ।


এ ছাড়া বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থানের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মতো অগ্রসরমান প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সুদৃঢ় করতে সম্মত হন দুই নেতা।