নির্ধারিত করের চেয়ে বেশি কর পরিশোধ করলে সেই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পেতে আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে উত্থাপিত অর্থবিল-২০২৬ এ প্রথমবারের মতো এমন একটি বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার আওতায় ব্যক্তি করদাতারা আয়কর রিটার্ন প্রক্রিয়াকরণের ৬০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত পাবেন।


নতুন বিধান অনুযায়ী, কর ফেরতের অর্থ সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্থানান্তর করা হবে। কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং করদাতাদের আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে এটিকে একটি যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।


অর্থবিলে বলা হয়েছে, বেতনভোগী ব্যক্তি, আর্থিক সম্পদ থেকে আয়কারী এবং কৃষি আয়ের ব্যক্তিগত করদাতারা এ সুবিধার আওতায় আসবেন। অনলাইন আয়কর রিটার্ন পোর্টালের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ হবে এবং রিটার্ন যাচাইবাছাই শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ করদাতার হিসাবে জমা হবে।


তবে কর ফেরতের আগে আয়কর রিটার্নের প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হতে হবে। এজন্য কর কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন প্রক্রিয়াকরণ শেষ করতে হবে। এরপর করদাতার প্রাপ্য অর্থ ৬০ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হবে।


সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থবিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সময়মতো রিফান্ড না দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অসদাচরণ (মিসকন্ডাক্ট) হিসেবে গণ্য হবে।


কর প্রশাসনের ইতিহাসে এ ধরনের জবাবদিহিমূলক বিধানকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অতীতে অতিরিক্ত কর ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা ও প্রশাসনিক অনীহার অভিযোগ ছিল ব্যাপক। নতুন বিধান কার্যকর হলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। বর্তমান অর্থবছর থেকেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সীমিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। ডিজিটাল কর প্রশাসনের অংশ হিসেবে রিফান্ড ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কর ফেরত ব্যবস্থা কর প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে করদাতারা নিশ্চিত হন যে, সরকারের কাছে তাদের অতিরিক্ত অর্থ আটকে থাকবে না। ফলে কর প্রদানের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা বাড়ে এবং কর প্রশাসনের প্রতি আস্থা তৈরি হয়।


তিনি বলেন, ‘আগামী অর্থবছর থেকে আমরা এই ব্যবস্থা চালু করতে চাই। করদাতারা যেন অতিরিক্ত কর পরিশোধের বোঝা বহন না করেন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।’


কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশিস বড়ুয়ার মতে, এটি দেশের কর ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের নীতিগত সংস্কার। তিনি বলেন, ‘কর আইনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এর মাধ্যমে করদাতা ও কর প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।’


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে করদাতারা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, অতিরিক্ত কর পরিশোধের পর তা ফেরত পাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে আবেদন ঝুলে থাকে। নতুন বিধান কার্যকর হলে কর ফেরতের প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়, সময়সীমাবদ্ধ এবং অধিকতর স্বচ্ছ হবে।


বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশেনের (বাজুস) ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইকবাল হোসেন চৌধুরী এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের কর প্রশাসনের বাস্তবতায় এমন ব্যবস্থা একসময় কল্পনারও বাইরে ছিল।


তবে জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতর্ক করে বলেন, আইনে বিধান যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তার ভাষায়, ‘রিফান্ড ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। এটি সঠিকভাবে কার্যকর করা গেলে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’


অর্থনীতিবিদদের মতে, করদাতাবান্ধব এ উদ্যোগ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ করদাতারা যখন দেখবেন যে সরকার তাদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ফেরত দিচ্ছে, তখন স্বেচ্ছায় কর পরিশোধ এবং রিটার্ন দাখিলের প্রবণতাও বাড়বে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল রিটার্ন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা- এই তিনটি পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের কর প্রশাসনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।