অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতসহ বিরাজমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনেক আগে থেকেই ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে সরকারি দপ্তরগুলো। বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে অতিজরুরি ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে কেনাকাটার লাগাম টেনে ধরা হয়েছিল। যা এখনো চলমান। বিশেষ করে সরকারি খাতের পরিচালন ব্যয় কমানোর জন্য বারবার তাগাদা দিয়ে আসছিলেন বিশ্লেষকরাও। অবশ্য এক্ষেত্রে খুব একটা সফল হতে পারেনি আগের কোনো সরকারই। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট আগামী জুনে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও সরকারি ব্যয়ে কাঁচি চালানো অব্যাহত রাখার নীতি অনুসরণ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো প্রয়োজনের চেয়েও ছোট বাজেট ঘোষণা করেছিল। আবার বিদায়ের আগে সেখান থেকেও কাটছাঁট করা হয়। তবু আর্থিক সংকট কমেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপ আর অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। বছর শেষে এই ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নের হার গত এক যুগে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাজেট ঘাটতি বেড়েই চলছে।
অর্থ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে আসছে বাজেটে। একই সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারগুলোও মেয়াদের শুরু থেকেই বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর বর্তমান সরকার। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচির পাইলটিংও শুরু হয়েছে। আগামী বাজেটে এসব প্রকল্পের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। ফলে অন্য খাতের ব্যয়ে কাঁচি চালানো হতে পারে বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা তো ভঙ্গুর এবং বিপর্যস্ত একটা অর্থনীতিকে অনেকটা স্থিতিশলীতার পথে নিয়ে এসেছি। বিশেষ করে ব্যাংক খাতকে একটা আস্থাজনক অবস্থায় আনার চেষ্টা করেছি। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাজেটের আকারও কমিয়ে ধরা হয়েছিল। কেননা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণটা বেশি জরুরি। বর্তমান সরকার হয়তো সে পথেই হাঁটবে। কেননা এখন তো ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের কারণে আরও নতুন বাস্তবতা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। অবশ্য এ পরিকল্পনা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারই করে গেছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট কাঠামো ঠিক করার মতো তেমন কোনো বৈঠক এখনো হয়নি। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিএনপি সরকার চাইলে এতে পরিবর্তন আনতে পারে। অবশ্য অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, নতুন বাস্তবতার কারণে আগের মতোই অনেকটা বাধ্য হয়ে বর্তমান সরকারকেও ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে হতে পারে। কারণ আগের বছরের তুলনায় বর্তমানে সংকট আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, যা পুরো বাজেট পরিকল্পনা উলটপালট করে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগের সরকারের রেখে যাওয়া কাঠামোর মধ্যেই বাজেটের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক চলছে। তবে নতুন বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাজেটের কাঠামোতেও সংশোধনী আনা হতে পারে। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে বাজেটের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে চায় নতুন এই সরকার। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে থেকে অর্থনীতির বহুমুখী চাপ সামলাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, রিজার্ভ ধরে রাখা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে এই সংকট অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এতে যুবসমাজ বিপথগামিতা থেকে রক্ষা পাবে, পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও দেশীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে ৩১ মার্চ থেকে প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় সে পরিকল্পনাও থাকছে আসছে বাজেটে।