র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন-২০২৬’ নামের ওই বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।
গতকাল ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বিলটি প্রত্যাহারের আবেদন জানান। পরে বিলটি উত্থাপিত হলে তা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কমিটিকে যাচাইবাছাই শেষ করে আগামী চার কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইন কার্যকর হলে র্যাব গঠনসংক্রান্ত বিধান রহিত হবে। প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন-এমন এসআরবি কর্মকর্তা তদন্তকারী কর্মকর্তার আইনগত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে কাউকে গ্রেপ্তার বা কোনো আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির হেফাজতে রাখা যাবে না। অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে বা জব্দ করা আলামত নিকটস্থ থানার হেফাজতে দিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনও দিতে হবে।
বিলটি উত্থাপনের সময় নতুন এই বাহিনীর রূপরেখা, প্রয়োজনীয়তা ও সময়সীমা নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়। বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিষ্ঠানের দোষ নেই, নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহিতা। তাই জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। তবে নতুন বাহিনী যেন নামসর্বস্ব না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার ও জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী র্যাব নামের সংগঠনটি আমরা বিলুপ্ত করছি। তবে সাইবার ক্রাইম, জুয়া ও মাদকের মতো অপরাধ দমনে পুলিশের অধীনে একটি অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এলিট ফোর্স প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। তাই বলে আমরা পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করে দেব? মাথা ব্যথা হলে মাথা কর্তন করা যায় না। প্রতিষ্ঠান যারা চালায়, সেই রাজনৈতিক অথবা মাফিয়া শক্তির দোষ হতে পারে, প্রতিষ্ঠানের কোনো দোষ নেই। নতুন বাহিনীর স্বচ্ছতা নিয়ে সংসদকে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই বিলে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন বাহিনীর কোনো সদস্য শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়ালে তার বিচারের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি সদস্য, মানবাধিকার কর্মী এবং জুডিশিয়াল কর্মকর্তা থাকবেন। ফলে অতীতের র্যাবের মতো বিতর্কিত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নতুন এই বাহিনীর থাকবে না। এর আগে র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, র্যাবের দ্বারা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এই জুলুমের কথা স্মরণ হলে এখনো অনেকে ঘুমাতে পারে না।
তবে নতুন বাহিনী যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তবে, দুজনের কয়েকদফা আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিলের বিধান অনুযায়ী, পুলিশের আওতায় এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠন করা হবে। এর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়। এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বিলে এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিলে এসআরবি সদস্যদের কর্তব্যে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য, দায়িত্ব পালনকালে নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীর সঙ্গে অসদাচরণ, অস্ত্র বা সরঞ্জাম হারানো, অবৈধভাবে অর্থ আদায়, জমি দখল, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত হওয়াকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব অপরাধে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো গুরুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এদিকে গতকাল ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ নামে আরও একটি বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ নামের একটি বিল উত্থাপন করেন। বিল দুটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।