রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বসবাসকারী ভাসমান ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৫,০০০ প্রান্তিক পরিবারের জন্য ৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এজন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৭৩৫ কোটি টাকা।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার কড়াইলসহ বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন করছে। অস্থায়ী ঘর, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। এ প্রেক্ষাপটে স্থায়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি তাদের জন্য একটি টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত ফ্ল্যাটগুলো হবে প্রায় ৫০০ বর্গফুট আয়তনের, যা একটি ছোট পরিবারের জন্য ন্যূনতম বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এতে থাকবে নিরাপদ বাসস্থান, উন্নত স্যানিটেশন ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অংশ হিসেবে ভাসমান ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় শুধু আবাসনই নয়, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্থায়ী পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত ৩১ মার্চ সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে একটি আধাসরকারি চিঠি (ডিও লেটার) পাঠিয়েছেন। চিঠিতে সমাজকল্যাণমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সরকারও মনে করছে, বস্তিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা ধীরে ধীরে স্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
প্রকল্পে মূলত ঢাকার ভাসমান ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে কড়াইলসহ বড় বস্তিগুলোর বাসিন্দারা অগ্রাধিকার পাবেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী আবাসন থেকে বঞ্চিত, তাদের পুনর্বাসনই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ আবাসন প্রকল্পটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং এটি সরকারের বৃহত্তর সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনার অংশ। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর চিঠিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের পাশাপাশি রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি। এসব উদ্যোগ মিলিয়ে একটি সমন্বিত পুনর্বাসন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা এ প্রকল্পটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জানিয়ে বলেছেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে- যেমন ঢাকায় জমির সীমাবদ্ধতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির ঝুঁকি, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, পুনর্বাসনের পর জীবিকা নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাসস্থান দিলেই হবে না, বাসিন্দাদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। ভাসমান মানুষের জন্য ৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণ উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে এটি রাজধানীর বস্তিবাসীদের জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্প নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা ও মানবিক উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ব্যবস্থার ওপর। এ ধরনের আবাসন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নগরে দারিদ্র্য কমানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।