নিয়মিত চাকরির বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী মাসে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতার এ দুই চেয়ার নিয়ে নজর রাখছেন আমলারা। কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিব তা নিয়ে নানা কানাঘোষা চলছে প্রশাসনের ভিতর-বাহিরে। বিশেষ করে নতুন করে কাউকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে না নিয়মিত ব্যাচ থেকে কাউ দায়িত্ব পাবে সেটা নিয়েই আগ্রহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।


মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব পদে পরিবর্তন আনার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে দাবি সরকার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের। যেসব সচিবের চাকরির মেয়াদ বা চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে, তাদের স্থলে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে ভিতরে ভিতরে। চুক্তির মেয়াদও শেষ হওয়ার পাশাপাশি আগস্ট মাসে কয়েকজন সচিব অবসরে যাবেন। ফলে কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে সচিব পর্যায়ে পরিবর্তন আসবে বলে জানা গেছে।


এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পদোন্নতি বদলি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রম। সরকার কাউকে চুক্তি নিয়োগ দেবেই এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে অনেক সময় অভিজ্ঞতা দক্ষতার কারণে এমন নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকার চাইলে চুক্তিও আসতে পারে, নতুন কেউ আসতে পারে। আমাদের সরকার মেধার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রশাসনের বর্তমান কাঠামোকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার গঠনের পাঁচ মাস পাড় হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। অনেক সচিব সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না, অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়রদের সঙ্গে সমন্বয় হচ্ছে না।


এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজের ক্ষেত্রে ভালো ও দক্ষ হাতে সামলাতে পারছেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা করে প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে পাঠানো হবে। কর্মদক্ষ ও গ্রহণযোগ্য কর্মকর্তাদের পরবর্তীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। প্রশাসন পরিচালনা সরকারকে সহযোগিতায় সবসময়ই নেতৃত্বে ভূমিকায় থাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সচিবালয়ে গত কয়েক দিন ধরে অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও বিভিন্ন ব্যাচের আলোচনায় উঠে আসছে কে হচ্ছেন নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদস্থ ও ১ নম্বর সরকারি কর্মকর্তা বলা হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে। তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধান এবং দেশের সব সিভিল সার্ভিসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রশাসনের প্রাণ বা প্রধান চালিকাশক্তি বলা হয়। যিনি পুরো সরকারি প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তারা চান চুক্তিতে আর কেউ নিয়োগ না পাক। নিয়মিতদের পদোন্নতি বা রদবদল করে দায়িত্ব দিলে প্রশাসনে দ্রুত গতি পাবে।


সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারও আগামী দিনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে চায় না। যারা অবসরে চলে গেছেন তাঁদের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মে কর্মকর্তাদের অনেক গ্যাপ হয়ে যাওয়ার কারণে সমন্বয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। চুক্তিতে নিয়োগ পেতে সরকার ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী এক কর্মকর্তা এবং এক মন্ত্রিসভার সদস্যের কাছে অনেকেই নিয়মিত ভিড়ছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৮৬ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। তিনজন ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়ে মোট ৮৯ জন থাকলেও তাদের মধ্যে ১০ জন বর্তমানে কোনো দপ্তরের দায়িত্বে নেই। ১০ জনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।


এরই মধ্যে আলোচনায় আসে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিব হওয়া নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে যোগ দেন বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বিএনপি সরকার গঠনের ঠিক আগে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশের ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পান।


জনপ্রশাসন সচিব অতিমাত্রায় কানকথা শোনেন। আবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে না আসার কারণে জনপ্রশাসন স্থবির হয়ে যায়। সচিব পর্যায়ে নিষ্পত্তি ফাইল অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এসব কারণে নতুন সরকারের পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও প্রশাসনে দৃশ্যমান গতি আনতে পারেনি। নাম প্রকাশ না করে এক সচিব বলেন, নতুন সরকারকে সহযোগিতা এবং প্রশাসনকে চাঙা রাখতে হলে এমন অফিসার জনপ্রশাসনে দিতে হবে যিনি অধিকাংশ জুনিয়র সিনিয়র কর্মকর্তাকে চেনেন। ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।