প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ইতোমধ্যেই ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই সরকার জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ। গতকাল সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এ সোলার এক্সপোর আয়োজন করে। বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে অবশ্যই সাশ্রয়ী পন্থায় বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এরই অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারাই এ উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে।’
তারেক রহমান বলেন, দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার কারণে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ডিজেলের মজুত বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যেই ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে সময়ক্ষেপণের পরিবর্তে আগামী দিনগুলোতে কীভাবে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যায়, বাসাবাড়ি এবং ব্যবসাবাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, বর্তমান সরকারের কাছে সেটিই প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা বাড়তি সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হবেন, তাদের কাছ থেকে প্রণোদনাসহ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে ক্রয় করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যেই অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলেছে। আমি নিজেও আমার বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপন করেছি। ইতোমধ্যেই আমার বাসায় ব্যবহারের পর বিদ্যুতের কিছু অতিরিক্ত ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছি।’ তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমানো হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘স্ফুরণ : টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পুরস্কার বিতরণ শেষে বিজয়ীদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি। এর আগে সোলার সিস্টেম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
খুলনায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সিজন-২ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী : আগামীকাল ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় ‘নতুন কুঁড়ি’র দ্বিতীয় আসর উদ্বোধন করবেন। দ্বিতীয় আসরে অংশগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করেছে। গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানান, যেখানে প্রথম আসরে রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৬৮ হাজার, সেখানে এবার সেই সংখ্যা কয়েক গুণ ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয় আসরে রেজিস্ট্রেশন করা এই খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে দল গঠন করা হবে। যার মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ ক্রীড়াবিদ নতুন কুঁড়ির এই আসরে অংশগ্রহণ করবেন। আগামী বছরের মে বা জুন মাসে এর ফাইনাল রাউন্ড শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। দ্বিতীয় আসরে নিবন্ধিতদের মধ্যে কিশোর বা বালকের সংখ্যা ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩ জন। কিশোরী বা বালিকার সংখ্যা ৬ লাখ ৭৯ হাজার ১৩৫ জন। এবার সর্বোচ্চসংখ্যক ৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২০ জন ফুটবলে নাম রেজিস্ট্রেশন করেছে।
চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ আজ : দ্বিপক্ষীয় সফরে ঢাকায় আসছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। তিনি আজ রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, তিন দিনের সফরে গতকাল রাতে ঢাকায় এসেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। সফরসূচি অনুযায়ী, বুধবার লিউ হাইশিং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে প্রাতরাশ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন লিউ হাইশিং। পরে তাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।
এ ছাড়া, ঢাকার মাতুয়াইলের একটি চ্যারিটি স্কুলের কার্যক্রম পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে চীনা মন্ত্রীর। তিন দিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার ঢাকা ত্যাগ করবেন লিউ হাইশিং।
উল্লেখ্য, লিউ হাইশিং-এর পিতা লিউ শুচুইং আশির দশকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮০ সালের আগস্টে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে পরিচয়পত্র পেশ করেছিলেন তিনি।