নেত্রকোনা ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের কোয়ার্টারে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ। শুরুতে দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আশ্বাস থাকলেও আট বছরেও সেই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়নি। শিক্ষক, আবাসন ও ক্লাসের সংকট, সীমিত হাতেকলমে শেখার সুযোগ নিয়েই প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ৩৩৩ শিক্ষার্থী। নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলেই মেডিকেল কলেজের কাজ শুরু হবে। যে জায়গাটা দেওয়ার কথা তা অনেকটা রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। অর্থাৎ মেডিকেল কলেজের সুবিধাটা পেতে হলে মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হবে। নতুন করে জায়গা নির্বাচন করার সুযোগ নেই। তাই যে দুটো জায়গা দেখা আছে তার মধ্যে চূড়ান্ত করতে হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে সব তথ্য জানিয়ে এসেছি। এখন যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল।’


বর্তমানে যেসব কলেজ অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, মাগুরা মেডিকেল কলেজ, নওগাঁ মেডিকেল কলেজ, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ, নীলফামারী মেডিকেল কলেজ ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় এসব মেডিকেল কলেজের সবই শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও ল্যাব সংকট রয়েছে।


পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র মেডিকেল কলেজ হিসেবে ২০১৪ সালে যাত্রা করে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ। ওই বছরই রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট ভবনে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কলেজটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। এরপর পুরো এক যুগ পার হলেও মেডিকেল কলেজটির জন্য কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ হয়নি। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নেই পর্যাপ্ত জনবলও। কলেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেসিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে শিক্ষকের ৫৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন। অধ্যাপক পদ শূন্য আছে ৭টি। এ ছাড়া সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকের ১৩টি করে পদ শূন্য রয়েছে। ৩৩ শূন্য পদে বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. প্রীতি প্রসুন বড়ুয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শহরের সুখী নীলগঞ্জ এলাকায় ২৮ একর জমির ওপর ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে।’


নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই নওগাঁ মেডিকেল কলেজেরও, কাটেনি জনবল সংকটও। কলেজ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কলেজটিতে একজন অধ্যক্ষ, ১২ জন অধ্যাপক, ২৩ জন সহযোগী অধ্যাপক, ২৬ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৬ জন প্রভাষক এবং দুজন কিউরেটরসহ মোট অনুমোদিত পদ ৯০টি। তবে এর বিপরীতে কর্মরত আছেন একজন অধ্যক্ষ, তিনজন অধ্যাপক, ৯ জন সহযোগী অধ্যাপক, ছয়জন সহকারী অধ্যাপক, ২৪ জন প্রভাষক এবং দুজন কিউরেটরসহ মাত্র ৪৫ জন। এদের মধ্যে আবার একজন কিউরেটর প্রেষণে আছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজে অনুমোদিত লোকবল ১০৯ জনের। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৭ জন। বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক সংকট থাকায় একজন শিক্ষককে ৩-৪টা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জামালপুর মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ নিজস্ব ক্যাম্পাস পেলেও জনবল সংকট কাটেনি। সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে শিক্ষকসহ মোট পদ রয়েছে ১৭৩। এর মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে কর্মরত রয়েছেন ৫৯ জন। পদ শূন্য রয়েছে ১১৪টি। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে ৯৪টি পদের মধ্যে ৫১টি পদ শূন্য আর জামালপুর মেডিকেল কলেজে ৮৬টি পদের বিপরীতে ৩১টি শূন্য। শিক্ষকের সঙ্গে আবাসন সংকটেও ভুগছেন অনেক কলেজের শিক্ষার্থীরা। সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ১০০ আসনের হোস্টেলে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে ৩১৮ জন ছাত্রীকে।


দেশের ৩৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজের (ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদী মেডিকেল কলেজে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যক্রম শুরুর কথা রয়েছে) প্রায় সবটিতে রয়েছে শিক্ষক, জনবল সংকটসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মোট শিক্ষক পদের ৪৩ দশমিক ৩৮ শতাংশই বর্তমানে শূন্য। ডিজিএমই-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মেডিকেল কলেজের সবটিতেই মৌলিক বিষয়ে শিক্ষকের পদ শূন্য আছে। বর্তমানে মেডিকেল কলেজগুলোয় মৌলিক বিষয়ে মোট শিক্ষক পদ রয়েছে ২ হাজার ৬৯টি। এর বিপরীতে শিক্ষাদান করছেন ১ হাজার ৫৬০ জন। অর্থাৎ মৌলিক বিষয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ পদ শূন্য। তবে তুলনামূলক নতুন কলেজগুলোতে বেসিক সাবজেক্টে শূন্য পদের হার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন মেডিকেল কলেজগুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও ল্যাব সংকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে এ ধরনের মৌলিক সুবিধার অভাব দেশে দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এতে স্বাস্থ্য খাত ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে পারছে না বলেও মত তাদের।


স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্যে ছয়টি মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্গঠন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভবন, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ এবং নার্সিং কলেজের পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি ৫০ শয্যার মেডিকেল কলেজের জন্য আদর্শভাবে ১৫ একর জমিই যথেষ্ট। নতুন পরিকল্পনায় বহুতল প্রশাসনিক ভবনের মাধ্যমে জায়গা ও নির্মাণ ব্যয় কমানো হবে।’ এদিকে মেডিকেল কলেজগুলোর সংকট বিশেষ করে শিক্ষক কাটাতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক সংকটের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘ক্লিনিক্যাল বিষয়ের তুলনায় অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রির মতো বেসিক বিষয়ে শিক্ষক ঘাটতি বেশি। এ সংকট মোকাবিলায় বেসিক বিষয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণোদনা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনা, অবসরপ্রাপ্ত যোগ্য শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’ বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর সংকট সমাধানের আগেই নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকারও। তারা এক মাসের ব্যবধানে দুটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে। গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি এবং গত ১৫ জুন নরসিংদী জেলায় নতুন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯-এ। এর আগে গত ২২ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জাতীয় সংসদে জানান, সরকার আরও সাতটি জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।