একদিকে মানহীন ও অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অনিয়মের অভিযোগে সিলগালা করা হয়েছে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল। সরকারি হাসপাতালের সেবা নিশ্চিতেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। বিভিন্ন হাসপাতালে সরেজমিন পরিদর্শনে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই। এর মধ্যেও প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ নিবন্ধনের ওপর নির্ভর করে হাসপাতাল চালু রেখেছে একদল বহিষ্কৃত আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক। যাদের সবাই ছিলেন জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় স্বৈরাচারের স্বপক্ষের শক্তি। ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কেউ কেউ। এখনো তারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে হাসপাতালটির ভিতরে গোপন মিটিং করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার আমলে দখল হওয়া রাজধানীর পরীবাগের লিবার্টি হাসপাতাল পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে উঠেছে এমন অভিযোগ। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। অদৃশ্য শক্তির বলয়ে ‘সবকিছু ম্যানেজ’ করে বহাল তবিয়তে চলছে হাসপাতালটি। অথচ মূল মালিকরা হাসপাতালটির নিয়ন্ত্রণ পেতে আদালতে মামলা করা ছাড়াও ঘুরছেন বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে। অপরদিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত লিবার্টি হাসপাতালে হাজারের বেশি অস্ত্রোপচার এবং ৫-৬ হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন। এতে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা আয় হলেও সরকারকে রাজস্ব হিসেবে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২২ সালে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক থেকে ও ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিক সেবা কার্যক্রম শুরু করে লিবার্টি হাসপাতাল। তখন ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরও নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল। দুই বছর আগে দুটির মেয়াদ ফুরালেও এখন পর্যন্ত নতুন করে নবায়ন করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর হাসপাতালটিকে জরিমানার পাশাপাশি পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। অথচ এক দিনও বন্ধ নেই হাসপাতালের কার্যক্রম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে হাসপাতালটির সেবা চালু করতে ব্যয় হয় ১০ কোটি টাকা। ২৫ জন পরিচালকের বাইরেও আরও ২০ জনের শেয়ার রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। পট পরিবর্তনের সময় হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম চৌধুরী। হাসিনা সরকারের পতন হলে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তার জায়গায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের জেনারেল সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক শেখ মুজাম্মেল হককে কাগজপত্র ছাড়া রেজুলেশন জালিয়াতি করে অবৈধভাবে লিবার্টি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বসানো হয়। লিবার্টি হাসপাতালের অন্তত পাঁচজন পরিচালক অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল দখলের পাশাপাশি বিএমইউ থেকে বিতাড়িত আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন ডা. মুজাম্মেল। এতে করে মূল মালিকদের সঙ্গে বিভেদ তৈরি হয়। এসব ঘটনায় হাসপাতালটির পরিচালক জাহিদুল ইসলাম উচ্চ আদালতে মামলা করেছেন। একই সঙ্গে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।


বেশ কয়েকজন মূল মালিক অভিযোগ করেন, বিএমইউ থেকে বহিষ্কার হওয়া সাবেক সহকারী প্রক্টর ও ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নাজির উদ্দিন মোল্লাহ বর্তমানে লিবার্টি হাসপাতালে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন। ওই সময় হামলায় জড়িত থাকার কারণে বহিষ্কৃত ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারুক হোসেন মুন্সী, নিউরো সার্জন ডা. ফরিদ রায়হান, মেডিকেল অফিসার ডা. শরিফ উদ্দিন সিদ্দিকীও তৎপর রয়েছেন। এ বিষয়ে লিবার্টি হাসপাতালের পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হাসপাতালের শুরু থেকে কেনাকাটাসহ নানা দুর্নীতির কারণে একাধিকবার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে পতিত আওয়ামী লীগের কিছু দুষ্কৃতকারী বাধ্যতামূলক ৮টি লাইসেন্স ছাড়াই হাসপাতালটি দখল করে পরিচালনা করছেন। জানতে চাইলে লিবার্টি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. শেখ মুজাম্মেল হক বলেন, তিন বছর ধরেই অভিযোগকারী ব্যক্তি বিভিন্ন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ দিয়ে আসছেন। আমাদের সব কাগজপত্র ঠিক আছে। যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি এ হাসপাতালের মালিক নন।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, নিবন্ধন নবায়ন না করে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ নেই। আমরা অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে বলার পর তিনি বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি জানা নেই। অভিযোগকারীরা অধিদপ্তরে এলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’