ইরানের সর্বোচ্চ প্রয়াত নেতা মোজতবা খামেনির সাথে সংশ্লিষ্ট লন্ডনের দুটি বিলাসবহুল পেন্টহাউস বিক্রির জন্য বাজারে তুলতে বাধ্য করা হয়েছে। এসব ভবনের নিবন্ধিত মালিক বর্তমানে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। তাই বন্ধকী ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি বিলাসবহুল ভবনটি নিলামে তুলছেন।
এর মধ্যে দিয়ে আবারও যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য গড়ে তোলা বিদেশি সম্পত্তি নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করলো। ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেনসিংটন প্যালেসের সম্মুখভাগে অবস্থিত লন্ডনের অন্যতম অভিজাত এলাকা ‘৩এ প্যালেস গ্রিন’-এর এই অ্যাপার্টমেন্ট দুটি মোট ৩৫.৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ডলার বা ১৭৭ মিলিয়ন দিরহাম) মূল্যে কেনা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় (রিসিভারশিপে) চলে গেছে।
এগুলোর মধ্যে একটি ২০১৬ সালে ১ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড দিয়ে কেনা পাঁচটি শোবার ঘরবিশিষ্ট ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। যা এখন ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের সামান্য কম দামে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেনার দামের চেয়ে প্রায় ৭০ লাখ পাউন্ড কম।
দ্বিতীয়টি ২০১৪ সালে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড দিয়ে কেনা হয়েছিল। এটিও এখন ‘রিসিভারশিপ’ বা ঋণদাতার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থাপনার আওতায় চলে গেছে। যদিও এটি প্রকাশ্যে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত না করায় এর সম্ভাব্য দাম জানা যায়নি।
ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কোনো সম্পদ বা সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য ঋণদাতা যখন একজন নিরপেক্ষ ‘রিসিভার’ বা তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন, তখন সেই প্রক্রিয়াকে ‘রিসিভারশিপ’ বলা হয়। ঋণদাতার পাওনা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ওই রিসিভার সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন।
যেসব বেসরকারি ঋণদাতা এই সম্পত্তি কেনার জন্য অর্থায়ন করেছিল, তারা এখন তাদের পাওনা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘রিসিভার’ (সম্পত্তি ব্যবস্থাপক বা তত্ত্বাবধায়ক) নিয়োগ করেছে। সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ আনসারির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা পর্যন্ত সম্ভবত জব্দ বা অবরুদ্ধ করে রাখা হবে।
১৯ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের নিচে
প্রকাশ্যে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত এই সম্পত্তিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য। ৩,৯৪৪ বর্গফুটের এই ডুপ্লেক্সটি ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলাজুড়ে বিস্তৃত এবং এতে কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত ছাদ-সংলগ্ন চত্বর (রুফ টেরেস) রয়েছে। এখান থেকে কেনসিংটন গার্ডেন্সের দৃশ্য উপভোগ করা যায় এবং ‘নাইট ফ্রাঙ্ক’ ও ‘সোথবি’স ইন্টারন্যাশনাল রিয়েলটি’ যৌথভাবে এটি বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিক্রয় সংক্রান্ত নথিপত্রে সম্ভাব্য ক্রেতাদের জন্য একটি অস্বাভাবিক জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পত্তিটি বর্তমানে রিসিভারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এজেন্টদের কাছে কোনো সম্পত্তির ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নথিপত্র থাকে, তার সবই তাদের কাছে নেই।
এরপরও বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য ক্রেতা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টগুলো পরিদর্শন করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় পেন্টহাউসটি ভবনের সপ্তম ও অষ্টম তলাজুড়ে অবস্থিত। সংবাদপত্রের উদ্ধৃত ‘ল্যান্ড রেজিস্ট্রি’র নথিপত্র থেকে জানা যায়, আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘টেনিও’-কে এর রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
‘দ্য সানডে টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপার্টমেন্টগুলো কেনার পর থেকে ‘প্যালেস গ্রিন’ আবাসন প্রকল্প এলাকায় আনসারি বা খামেনি কাউকেই দেখা যায়নি।
নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল
আনসারির আর্থিক নেটওয়ার্ক বা কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারির মধ্যেই এই বিক্রয় প্রক্রিয়াটি চলছে। ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’-এর কর্মকাণ্ডে আর্থিকভাবে সহায়তা করার অভিযোগে ব্রিটেন ২০২৫ সালের অক্টোবরে আনসারির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আওতায় তার সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতা ঘোষণা করা হয়। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ওই ইরানি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তিনি বিদেশে রিয়েল এস্টেট ও বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় অসংখ্য ‘শেল কোম্পানি’ (নামসর্বস্ব বা কাগুজে কোম্পানি) ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন।
এতে বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কটি ব্রিটেন, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, স্পেন এবং সাইপ্রাস জুড়ে বিস্তৃত ছিল। পাশাপাশি অভিযোগ করা হয়েছে,আনসারির নামে থাকা অনেক আর্থিক সম্পদের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী ছিলেন খামেনি, তার পরিবার, ইরানের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইআরজিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রণালয় আনসারিকে বর্তমানে বিলুপ্ত ‘আয়ান্দেহ ব্যাংক’-এর সাথেও যুক্ত করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সেখানে নিজের পদ ব্যবহার করে অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছেন এবং বিদেশে নিজের ব্যবসার প্রসারের সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনসারি কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।
লন্ডনের অভিজাত সম্পত্তি চাপের মুখে
‘প্যালেস গ্রিন’-এর পেন্টহাউসগুলোর ভাগ্য নিষেধাজ্ঞা অভিযানের একটি বাস্তব পরিণতি তুলে ধরে। পশ্চিমা কর্তৃপক্ষ ইরানের নেতৃত্বের সাথে যেসব মূল্যবান বিদেশি সম্পদের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোর অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা বা নগদীকরণ ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বন্ধকী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা (মর্টগেজ ডিফল্ট) দিয়ে এটি প্রমাণ হয় না যে, খামেনি নিজে নগদ অর্থের সংকটে পড়েছেন। তবে সম্পদ জব্দ হওয়া, একজন প্রধান অর্থায়নকারীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং রিসিভারশিপ বা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে চলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয়, ইরানের নেতৃত্বের জন্য লাভজনক বলে বিবেচিত বিদেশি আর্থিক কাঠামোর অন্তত একটি অংশের ওপর চাপ বাড়ছে। সম্পত্তিগুলোর অসাধারণ অবস্থানের বিষয়টিও এদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে।
প্যালেস গ্রিন এলাকাটি কেনসিংটন প্যালেস এবং কেনসিংটন প্যালেস গার্ডেন্সকে ঘিরে গড়ে ওঠা কূটনৈতিক এলাকার পাশেই অবস্থিত। ব্রিটেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আগে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অ্যাপার্টমেন্টগুলো ইসরায়েলি দূতাবাসের খুব কাছে অবস্থিত; দূতাবাসটিও একই রাস্তায় রয়েছে। আপাতত বিক্রয়লব্ধ অর্থের ওপর ঋণদাতাদেরই প্রথম দাবি থাকবে।
১৯ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের পেন্টহাউসটি যদি বর্তমানের ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের কম চাহিদামূল্যের কাছাকাছি দামে বিক্রি হয়, তবে তা এক দশক আগের কেনা দামের তুলনায় বড় ধরনের দরপতনের বিষয়টি স্পষ্ট করবে। আর বন্ধকী ঋণ পরিশোধের পরও যদি কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে, নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা অবস্থায় সেই উদ্বৃত্ত অর্থ আনসারিকে ফেরত না দিয়ে জব্দ করে রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
ওয়াশিংটন কর্তৃক ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক মহলের সাথে সম্পৃক্ত বলে চিহ্নিত বিদেশি সম্পত্তি নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে, সম্পত্তি বিক্রির চেয়েও হয়তো এই বিষয়টিই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। লন্ডনে অবস্থিত তাদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্পত্তিগুলো এখন আর কেবল সম্পদ ধরে রাখার মাধ্যম নয়, আর্থিক ও নিষেধাজ্ঞাজনিত চাপের মুখে সেগুলোর মালিকানা বা অস্তিত্ব গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে।