ইরান এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে- যেখানে রাজপথের বিক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, দ্রুতবিচার ও মৃত্যুদণ্ড, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর দাবি, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের আড়ালে অভিযান, আইআরজিসি ও সহযোগীদের ভূমিকা, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ- সব মিলিয়ে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাই নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্পর্শকাতর মোড়...
১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের কথা যারা মনে রেখেছেন, তারা আজ অর্থাৎ ২০২৬ সালের নতুন বর্ষবরণের প্রাক্কালে ইরানের খামেনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মতো একটি অদ্ভুত পরিহাস লক্ষ্য করেছেন! যে শাহ এবং তাঁর শাসনব্যবস্থাকে সে সময়ের সাধারণ মানুষ উৎখাত করেছিল, আজ তাঁর ছেলেই আজকের দিনে একটি সম্ভাব্য ‘পাল্টা-বিপ্লবের’ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। এর প্রধান কারণ- সে সময়ের মানুষের অভিযোগগুলোর সঙ্গে আজকের প্রজন্মের অভিযোগগুলোর এক দারুণ মিল রয়েছে। তৎকালীন শাসক- সিআইএ-সমর্থিত ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে ইরানিরা দীর্ঘ বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের পর তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। অতঃপর তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। আর সেই বিপ্লবী আন্দোলনে নির্বাসিত একজন ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের প্রধান মুখ।
একটি জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা
শাহের পতনের পর খোমেনি যে ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তৎকালীন ইরানিদের মধ্যে যে মার্কিন বিরোধী মনোভাব ছিল- তা সেই বিপ্লবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। কয়েক দশক ধরে যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি কেবল কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখা হতো, সেখানে ইরান বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটায়। তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব কেবল ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। যদিও শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের ওপর আক্রমণ বড় ভূমিকা রেখেছিল, কিন্তু বিরোধীদের মূল চালিকাশক্তি ছিল ব্যাপক দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বৈষম্য- যা তেলের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলছিল না। বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছরে ইরানের সমাজ ও অর্থনীতি কীভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে, তা বুঝতে পারলেই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে। ইরানকে কেবল ‘উগ্র মৌলভিদের’ দ্বারা পরিচালিত একটি রাষ্ট্র হিসেবে মনে করা হলেও বাস্তবতার চিত্রটি আরও জটিল। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ খামেনি অত্যন্ত কঠোর এবং এককেন্দ্রীকভাবে দেশ শাসন করছেন, যা মূলত ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
বাজারিদের ধর্মঘট ও অর্থনৈতিক সংকট
ইরানি নেতৃত্ব বিক্ষোভের জন্য দৃশ্যত- আমেরিকা ও ইসরায়েলকে দোষারোপ করলেও, লক্ষণীয় বিষয় হলো সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক কারণে। এই প্রতিবাদের শুরুটা হয়েছিল ইরানের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘বাজার’ থেকে। ইরানের বাজারের ব্যবসায়ীরা বা ‘বাজারি’রা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন ইরানের মুদ্রার ধস এবং এর ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রতিবাদে। ১৯৭৯ সালে শাহের অতি-আধুনিকীকরণের ফলে তাদের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়েছিল বিধায় তারা বিপ্লবে যোগ দেন। বর্তমান সময়ে তাদের এই প্রতিবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২-২৩ সালে হিজাব ইস্যুতে তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে খামেনি শাসনের পতনই বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আবারও প্রমাণিত, ক্ষোভের কারণ কেবল দমন-পীড়ন নয়, বরং তার চেয়েও গভীর কিছু।
ইরানের জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশেরই বয়স ৩৯ বছরের নিচে। তাদের কাছে ৪৭ বছর আগের সেই বিপ্লব বা শাহ আমলের স্মৃতি খুবই ঝাপসা। তবে এটি পরিষ্কার যে, এই লড়াই কেবল শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ‘গভীর পরিবর্তন’!
আমস্টারডামের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রির গবেষক কায়হান ভালাদবেগি আল-জাজিরায় লিখেছেন, ২০০৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘বিরাষ্ট্রীয়করণ’ বা ব্যক্তিগতকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো আইআরজিসি এবং ধর্মীয় ফাউন্ডেশনগুলোর (যাকে বোনিয়াদ বলা হয়) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এক শক্তিশালী কর্পোরেট সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। আইআরজিসি এবং বোনিয়াদগুলো এখন সম্মিলিতভাবে ইরানের অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বর্তমান বিক্ষোভকারীদের লড়াই কেবল শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং এই বিশাল আর্থিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও।
পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
বিক্ষোভকারীরা উৎসাহিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো- সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের শীর্ষ জেনারেলরা নিহত হয়েছেন এবং ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংসের দিকে। তা সত্ত্বেও আইআরজিসি এখনো সুপ্রিম লিডারের প্রতি অনুগত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে হস্তক্ষেপের কথা বললেও সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে রাজপথে নামার আহ্বান জানান এবং ১০০ দিনের ‘ট্রানজিশনাল প্ল্যান’ বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, যা মূলত ইরানের অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার সর্বশেষ
সাম্প্রতিক অস্থিরতার সর্বশেষ
যে তথ্য জানা গেল
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন- ইরানে ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই’; আকাশপথ পুনরায় উন্মুক্ত; তবে পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকদের অতিদ্রুত ইরান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন
♦ আকাশপথের পরিস্থিতি :
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর, বৃহস্পতিবার ইরান তাদের আকাশপথ পুনরায় খুলে দিয়েছে। এই অচলাবস্থার কারণে অনেক এয়ারলাইনস তাদের ফাইট বাতিল, রুট পরিবর্তন বা বিলম্ব করতে বাধ্য হয়েছিল।
♦ ট্রাম্পের বক্তব্য ও মৃত্যুদণ্ড স্থগিত :
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কার মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার জানিয়েছেন যে, তিনি ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রে’ জানতে পেরেছেন- ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা বন্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই- আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমনটাই জানতে পেরেছি।’ এর আগে খবর ছড়িয়েছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সেটি কী ধরনের হবে তা স্পষ্ট ছিল না। বুধবার রাতে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
স ইরানের প্রতিক্রিয়া :
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ফক্স নিউজকে বলেছেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতিশোধ হিসেবে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ‘কোনো পরিকল্পনা নেই’। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ফাঁসি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর প্রথম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিক্ষোভকারী এরফান সুলতানির পরিবারকে জানানো হয়েছে যে, তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
♦ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ও সতর্কতা :
০১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৃহস্পতিবার ইরান ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
০২. আর একই সঙ্গে সতর্কতা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কিছু কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তেহরানে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
০৩. তা ছাড়া ভারত, স্পেন, ইতালি এবং পোল্যান্ডের সরকার তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের তুরস্ক বা আর্মেনিয়া হয়ে স্থলপথে ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে।
০৪. পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি দাবি করেছেন, পরিস্থিতি এখন ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন শান্ত। আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং আমরা এমন কোনো উত্তেজনায় যাব না যা সবার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
♦ ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিটস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)-এর তথ্যমতে, ইরানি শাসকদের দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ২,৫৭১ জনে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১৮,১০০-এরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
♦ জি-৭ এর হুঁশিয়ারি :
জি-৭ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জানিয়েছেন যে, তারা ইরানের ওপর আরও অতিরিক্ত বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে প্রস্তুত। বিক্ষোভকারীদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা, হত্যা, নির্বিচারে আটক এবং ভয় দেখানোর কৌশলের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জোটটি।
ইরানের ভয়াবহ দমন-পীড়নের নেপথ্যে কারা ছিলেন?
ইরানের ভয়াবহ দমন-পীড়নের নেপথ্যে কারা ছিলেন?
মাত্র কয়েক দিনে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নে রক্তপাত এমন ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে যে, দেশটি ও আন্তর্জাতিক মহল উভয়ই সংকটের মুখোমুখি। মৃতের সংখ্যা ও দায়ীদের পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এখন প্রশ্ন- কার হাতে শতাব্দীর এই দমন-অভিযান প্রকৃতপক্ষে ঘটছে?
নিহতের সংখ্যা : কতজনের প্রাণহানি?
সংখ্যা নিয়ে কোনো একক বা নিশ্চিত পরিসংখ্যান নেই। আমেরিকান হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিটস নিউজ এজেন্সি জানাচ্ছে- কমপক্ষে ৩,০৯০ জন নিহত, যার মধ্যে ২,৮৮৫ জন বিক্ষোভকারী। ইরান ইন্টারন্যালনাল ও কিছু বিদেশি সূত্র দাবি করছে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১০,০০০-২০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। ইরানের সরকারি পক্ষ যদিও স্বীকার করেছে মোটামুটি ২,০০০-৩,০০০ মৃতের সংখ্যা, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষতিও এতে অন্তর্ভুক্ত আছে বলে প্রকাশ হয়েছে। এ ধরনের বিস্তৃত বিভেদের পেছনে বড় একটি কারণ হলো দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করা- যা তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইকে কঠিন করে তুলেছে।
দমন-পীড়নে ‘কারা’ দায়ী?
ইরান সরকার বারবার দাবি করেছে যে, এই সহিংসতা কেবল ‘ঘৃণিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ এবং বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ব্যবস্থাপনার ফল। বিশেষত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপ্রাপ্ত লোকজনের জন্য ইরানের আজকের পরিস্থিতি। সরকার এই হামলার জন্য সরকারের বাহিনীকে বাৎসরিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একটি নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবেও ঢেকে দেখাতে চেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকরা সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস-এর বড় ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করছেন। আইআরজিসি ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত বাহিনীই দেশের বেশির ভাগ শহরে দুর্বৃত্ত অবস্থানে মোতায়েন ছিল এবং তাদের উপস্থিতি বহু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাস্তায় মোতায়েন করা প্রধান বাহিনী ছিল ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস। এক ভিডিওতে পশ্চিম তেহরানে ভারী মেশিনগান সজ্জিত একটি পিকআপ ট্রাক দেখা গেছে যা আইআরজিসির ‘ইমাম আলী সিকিউরিটি ইউনিট’-এর ব্যবহৃত যানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই ইউনিটটি মূলত রাজধানীতে নিরাপত্তা অভিযানের দায়িত্বে থাকে। অনেক বিশ্লেষক আইআরজিসির বিদেশের শাখা ‘কুদস ফোর্স’-এর অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
বিদেশিদের সংশ্লিষ্টতার দাবি
বিক্ষোভ শুরুর পরই কিছু সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওতে ইরাকি মিলিশিয়া এবং বিদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি দেখানো হলেও, এখন পর্যন্ত সরকারি বা নিরপেক্ষ যাচাইকৃত প্রমাণ এই দাবির পক্ষে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। কিছু সূত্রমতে, পশ্চিম তেহরানে ইরাকি মিলিশিয়া পতাকা এবং সমর্থনকারীদের সমাবেশের ভিডিও শেয়ার হয়েছে। তবে এর বাস্তব ভূমিকা ও ঘটনাসংখ্যা স্পষ্ট নয়।
দাবি, মাদকের প্রভাব রয়েছে
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে দাবি করেছেন, কিছু বিক্ষোভকারী সহিংসতায় নয় বরং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ড্রাগের ওভারডোজে মারা গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এর ব্যাখ্যা ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে ভিন্নমতাবলম্বী কর্মীরা সন্দেহ করছেন, বিক্ষোভ দমনে নিয়োজিত বাহিনীকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলতে- ‘ক্যাপটাগন’ নামক এক ধরসের অ্যাম্পফেটামিন ড্রাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
কে এই নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি?
কে এই নির্বাসিত রাজপুত্র
রেজা পাহলভি?
ইরানের নির্বাসিত ‘যুবরাজ’ রেজা পাহলভি এমন একটি নাম; যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজতন্ত্রের স্মৃতি, বিপ্লবের ক্ষত আর আজকের ইরানের অস্থির রাজনীতির নতুন সমীকরণ। ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর তেহরানে জন্ম রেজা পাহলভির। তিনি ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং রাজসিংহাসনের ঘোষিত উত্তরাধিকার। মাত্র ছয় বছর বয়সেই তাঁকে যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন মনে করা হচ্ছিল, একদিন তিনিই বসবেন সিংহাসনে। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন পথে মোড় নেয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়, তাঁর বাবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, আর রেজা পাহলভির ভবিষ্যৎ চিরতরে নির্বাসনের ছায়ায় ঢেকে যায়। কৈশোরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। টেক্সাসের রিস বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ নেন। বিপ্লবের সময় তিনি দেশেই ছিলেন না; ফলে নতুন ইসলামি সরকার তাঁকে ইরানে ফেরার অনুমতি দেয়নি। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। নির্বাসিত জীবনে রেজা পাহলভি নিজেকে ধীরে ধীরে একজন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বিক্ষোভকারীদের শুধু রাস্তায় নামার আহ্বান দিয়েই থামেননি; বরং ইরানের শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং তা ধরে রাখার প্রস্তুতির ডাক দিয়েছেন। এমনকি নিজের ‘প্রত্যাবর্তনের’ কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলভি ও তিন কন্যাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত রেজা পাহলভির জীবনের বড় অংশ কেটেছে- নিজ দেশ, সিংহাসন আর নিজের জনগণকে নিয়ে।
কে এই ২৬ বছর বয়সি এরফান
কে এই ২৬ বছর বয়সি এরফান
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মাত্র দুই দিনের বিচারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তরুণের নাম এরফান সুলতানি। ২৬ বছর বয়সি এ যুবককে ফাঁসিতে ঝোলানোর কথা ওঠে- এমন খবরে দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনায় সরব হয় বিশ্ব। এরফানের বাড়ি রাজধানী তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের শহর কারাজের ফারদিস এলাকায়। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর পরিবারকে জানানো হয়, বিচার শেষ হয়েছে এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যদিও এই আদেশ স্থগিত রাখা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্পগুলো কী কী?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্পগুলো কী কী?
সাম্প্রতিক ইরান উত্তেজনায় এই সম্ভাবনা খুবই জোরালো যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বিমান হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। গত কয়েক দিনে তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে- ‘সাহায্য আসছে’। কিন্তু সেই সাহায্য কী এবং তা কখন আসবে? ইরানি শাসকরা ঠিক সেটাই করেছেন যা ট্রাম্প না করতে সতর্ক করেছিলেন। তথ্য বিভ্রাট বা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন হলেও এটি স্পষ্ট যে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই মুহূর্তে সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্প হলো- ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস এবং তাদের সহযোগী বেসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত সামরিক ঘাঁটি ও গুদামগুলোতে বিমান হামলা চালানো। বাসিজরা হলো আইআরজিসির অনুগত স্বেচ্ছাসেবী। যদিও উপসাগরীয় মিত্রদের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে তিনি ইরানে হামলা থেকে সরে আসেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রিয় সামরিক কৌশলটি বেছে নিতে পারেন, তা হলো- ‘সার্জিক্যাল অপারেশন’। এটি এমন এক নিখুঁত অপারেশন যেখানে মার্কিন বাহিনীর প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে সর্বনিম্ন। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো ইরাক, আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফাঁদে পা দিতে চান না। আমেরিকানরা যে দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত, তা ট্রাম্প ভালোভাবেই বোঝেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে নিখুঁত অভিযানের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসন বেশ আত্মবিশ্বাসী।