আজ ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। দেশটির প্রায় ২১ কোটি ভোটারের মধ্যে ইতিমধ্যেই আগাম ভোট দিয়েছেন সাড়ে ৫ কোটি ভোটার। এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হবে। এছাড়া ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্ণর নির্বাচন করবেন ভোটাররা।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বইছে নির্বাচনি উত্তাপ। টেলিভিশনের রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের বাঙালিপাড়ার আড্ডা-সবখানেই আলোচনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে? প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কি কংগ্রেসে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটদের ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে পাল্টে যাবে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সমীকরণ? শেষ মুহূর্তে দুই দলের প্রচারণা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর জনমত জরিপ ঘিরে জমে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াই। এবারের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন দখলের লড়াই নয়; ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কতটা নির্বিঘ্নে চলবে, তারও বড় পরীক্ষা। বর্তমানে হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রিপাবলিকানদের হাতে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণও নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন পাস, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
কংগ্রেসের হিসাব কী বলছে : যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। বর্তমানে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। একটি আসনে স্বতন্ত্র সদস্য আছেন এবং দুটি আসন শূন্য। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে অল্প কয়েকটি আসনের ফলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ১০০ সদস্যের সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন রয়েছে। দুই স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোকক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করেন। এবার সিনেটের ৩৩টি নিয়মিত আসনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ নির্বাচনে ভোট হচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন অতিরিক্ত জিততে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হলেও সিনেটররা নির্বাচিত হন ছয় বছরের জন্য।
এবার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন এবং রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য পদেও ভোট হচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার লড়াইয়ের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনে। জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে, কিন্তু জয় কি নিশ্চিত? সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স-ইপসসের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৩৬ শতাংশ। একই জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। তবে জাতীয় জরিপে এগিয়ে থাকা মানেই প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত নয়। ভোটারদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে নিত্যপণ্যের দাম, আবাসন ব্যয়, স্বাস্থ্যবিমা, জ্বালানির মূল্য এবং অভিবাসননীতি। ডেমোক্র্যাটরা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, করছাড় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে ভোট চাইছেন। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতও নির্বাচনি বিতর্কে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে জরিপের হিসাব নিয়ে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস থাকলেও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ইলেকটোরাল কলেজে স্পষ্ট ব্যবধানে জয়ী হন। তাই এবারও কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে নির্বাচনের ফল।
মিশিগানে মুসলিম প্রার্থীর ইতিহাস গড়ার লড়াইয়ে নতুন নাটক : এবারের নির্বাচনে বিশেষ নজর কেড়েছে মিশিগানের সিনেট আসন। ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদ জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হবেন। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে নিজ দলের ভিতর থেকেই বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন তিনি। গত রবিবার ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেনস নিজ দলের প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে অবস্থান নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় স্টিভেনস বলেন, এল-সাঈদ তাঁকে জানিয়েছেন যে তাঁর নির্বাচনি প্রচারণায় স্টিভেনসকে আর স্বাগত জানানো হচ্ছে না এবং তাঁকে দূরে থাকতে হবে। এ কারণেই তিনি রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। গত আগস্টে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে এল-সাঈদের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন স্টিভেনস। পরে তাঁকে সমর্থনের ঘোষণা দিলেও ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্য এবং একটি বাইরের সংগঠনের নির্বাচনি বিজ্ঞাপন নিয়ে তাঁদের বিরোধ তীব্র হয়। স্টিভেনসের অভিযোগ, বিজ্ঞাপনটিতে ইসরায়েলকে ঘিরে আপত্তিকর বক্তব্য ছিল। এল-সাঈদ জানিয়েছেন, বিজ্ঞাপনটি তাঁর প্রচারণা শিবির তৈরি করেনি এবং এর বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। স্টিভেনসের সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা একে নিজেদের জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখছেন। তবে সাম্প্রতিক নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা জরিপে এল-সাঈদ এগিয়ে থাকায় মিশিগানের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। শেষ মুহূর্তের এই দলীয় বিভক্তি ভোটের বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় নারী ও আদিবাসী প্রার্থীরা : শুধু দুই দলের ক্ষমতার লড়াই নয়, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বেও নতুন ইতিহাস গড়তে পারে। আলাস্কায় ইয়ুপিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মেরি পেলটোলা রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মিনেসোটায় সিনেটের লড়াইয়ে রয়েছেন আদিবাসী নারী পেগি ফ্লানাগান। তাঁদের কেউ জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম আদিবাসী নারী নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস তৈরি হবে। অন্যদিকে ইলিনয়ে কৃষ্ণাঙ্গ নারী জুলিয়ানা স্ট্র্যাটনের প্রার্থিতাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব প্রার্থীর প্রচারণায় অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের পাশাপাশি নারী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও উঠে এসেছে।
ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কতটা চাপে পড়বেন ট্রাম্প : প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে। সরকারি ব্যয়, অভিবাসন অভিযান, শুল্কনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত এবং শুনানির উদ্যোগ নিতে পারবেন তাঁরা। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিমার ভর্তুকি, মেডিকেইড ও খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয়সংকোচন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রিপাবলিকানদের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি ও সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও তাঁদের তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তবে কোনো নীতি পরিবর্তন করতে গেলে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা তিনটি পৃথক শাখার ওপর প্রতিষ্ঠিত-আইন প্রণয়নের জন্য কংগ্রেস, আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন নির্বাহী বিভাগ এবং আইনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যার জন্য বিচার বিভাগ। ক্ষমতার এই ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থাই ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস’ নামে পরিচিত।
প্রেসিডেন্ট কোনো বিল ভেটো দিলে তা আইনে পরিণত করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের এমন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা কম। ট্রাম্পও সম্প্রতি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তিনি তাঁদের উদ্যোগে ভেটো দেবেন এবং শেষ পর্যন্ত সমঝোতার প্রয়োজন হবে। ফলে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ অক্ষত থাকবে; বরং হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়তে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন অপেক্ষার পালা। জরিপ, পূর্বাভাস আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে যত আলোচনাই হোক, সম্ভাবনা আর বিজয় এক নয়। ট্রাম্পের রাজনৈতিক আধিপত্য অটুট থাকবে, নাকি ওয়াশিংটনে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হবে-তার প্রথম জবাব মিলবে ৩ নভেম্বরের ভোটে।