বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে যে ইপিএ (ইকোনমিক কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা শুধু অর্থনীতি-বাণিজ্য নয়, রাজনীতি ও কূটনীতিতেও প্রভাব রাখবে। চুক্তির ভূমিকায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ চুক্তি শুধু পক্ষগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে না বরং তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে, যা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অর্থনীতির পাশাপাশি শান্তি ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চুক্তিপত্রের কপি প্রকাশ করা হয়েছে। ১ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এ চুক্তিতে ২২টি অধ্যায় রয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইপিএ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ, যেটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন এবং যুগান্তকারী চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ চুক্তির ফলে জাপান এবং বাংলাদেশ একে অপরের বাজারে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে। চুক্তির দিন থেকে বাংলাদেশ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে জাপানের বাজারে এবং জাপান ১ হাজার ৩৩৯টি পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক সুবিধা ছাড়াও বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় এ চুক্তিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ভূমিকা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, এ চুক্তি পক্ষগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনে মুক্ত, ন্যায্য এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে স্বীকার করে। একই সঙ্গে বাজারবহির্ভূত নীতি ও অনুশীলন এবং এ ধরনের শৃঙ্খলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-এমন জোরপূর্বক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই ‘জোরপূর্বক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ বলতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের চাপিয়ে দেওয়া শুল্কব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


থাকছে না ভর্তুকি সুবিধা : চুক্তির ধারা ২.৬-তে বলা হয়েছে, প্রতিটি পক্ষই অন্য পক্ষের কাছে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর তার শুল্ক কমানোর চেষ্টা করবে। ধারা ২.৭-এ বলা হয়েছে, কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের জন্য নির্ধারিত পণ্যের ওপর কোনো রপ্তানি ভর্তুকি চালু বা বজায় রাখবে না, যা ভর্তুকি এবং প্রতিপালন চুক্তির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।


দেশীয় শিল্পে গুরুতর ক্ষতি হলে ন্যূনতম শুল্ক : এ চুক্তির ফলে চুক্তিবদ্ধ দেশ দুটির কোনো একটির দেশীয় শিল্প গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়লে সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে এর সমন্বয় সহজতর করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিমাণে একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারবে। এ সুরক্ষাব্যবস্থা ৩ বছরের বেশি হবে না। তবে উচ্চঝুঁকি বা অনিবার্য কারণে তা সর্বোচ্চ ৬ বছর প্রয়োগ করা যেতে পারে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো আগে থেকে শ্রম খাতের কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করছে। ফলে জাপানের ক্ষেত্রে এসব শর্ত আমাদের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না।’


অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম পরিবহন সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া যাবে না : চুক্তিতে গোপনীয়তার একটি অংশ রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে-এ চুক্তির অধীনে কোনো পক্ষকে এমন কোনো তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য করা যাবে না, যা প্রকাশের বিষয়টি তার অপরিহার্য নিরাপত্তা স্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করে। এ ছাড়া কোনো পক্ষকে তার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে: অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম পরিবহন সম্পর্কিত এবং অন্যান্য পণ্য ও উপকরণ পরিবহন সম্পর্কিত, অথবা সামরিক প্রতিষ্ঠান সরবরাহ বা ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচালিত পরিষেবা সরবরাহ সম্পর্কিত; গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক অবকাঠামো, যা সরকারি মালিকানাধীন বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জল অবকাঠামোসহ জাতীয় জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যান্য জরুরি অবস্থার সময় নেওয়া; অথবা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘ সনদের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা অনুসরণে কোনো পক্ষকে কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধা দেওয়া যাবে না। চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি পক্ষ, তার আইন ও বিধি অনুসাওে, এ চুক্তি অনুসারে অন্য পক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখবে।