মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ইরানে মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানে যোগ দেবে না ইসরায়েল। গতকাল দেশটির সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলেও দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত যুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতি রয়েছে ইরানের। এদিকে যুদ্ধের ৩২তম দিনে কুয়েত বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক ও কাতারে তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে তারা।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল হামলা চালায়, তবে তাতে ইসরায়েলি সেনারা অংশ নেবে না। এ ধরনের যেকোনো অভিযানের দায়িত্ব ইসরায়েল শুধু মার্কিন সেনাদের ওপরই ছেড়ে দেবে। ওয়াশিংটন যখন এ সংঘাতে নিজেদের ভূমিকা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে, ঠিক তখনই এ প্রতিবেদন প্রকাশ পেল। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে সামরিক হামলা বন্ধ করতে পারে। আর তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হলেও সেটা হতে পারে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযান শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘সফল কূটনীতি’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি পূবর্শর্ত কি না-সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘তা নয়। ইরানকে কোনো চুক্তি করতে হবে না। আমার সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি করতে হবে না।’ এর আগে যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে ১৫ শর্তের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এ প্রস্তাবগুলো না মানলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে ইরান। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও সক্ষম। তেহরান সময়সীমার দিকে নজর দেয় না এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশটি নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিয়েছে এবং আলোচনা চলছে বলা ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি সঠিক নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু বার্তা বিনিময় হয়, যা আলোচনা নয়। যুদ্ধের ৩২তম দিনেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গতকাল ইরানের ড্রোন হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি স্টোরেজ ট্যাংকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তবে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল রাজি জানান, হামলাটি সরাসরি বিমানবন্দরের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কুয়েত অ্যাভিয়েশন ফুয়েল কোম্পানির স্টোরেজ ট্যাংক লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। ড্রোন আঘাত হানার পরপরই সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে সকালে তিনটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়া হয়। এর মধ্যে দুটি মিসাইল প্রতিহত করতে সমর্থ হয় তাদের সেনারা। কিন্তু একটি মিসাইল তেলের ট্যাংকারে আঘাত হানে। হামলার শিকার ট্যাংকারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জির কাছে লিজ দেওয়া ছিল। হামলার সময় এতে ২১ জন ক্রু ছিলেন। যাদের সবাইকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। গতকাল আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, তারা অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, টেসলা ও বোয়িংয়ের মতো ১৮টি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাবে। তাদের অভিযোগ, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে’ এ কোম্পানিগুলো সরাসরি সম্পৃক্ত। আইআরজিসি এ কোম্পানিগুলোকে ‘সন্ত্রাসবাদী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের কর্মচারীদের অবিলম্বে কর্মস্থল ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে চীন-পাকিস্তানের পাঁচ প্রস্তাব : ইরান যুদ্ধ বন্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যৌথভাবে ‘পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব’ ঘোষণা করেছে চীন ও পাকিস্তান। গতকাল বেইজিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এ প্রস্তাব পেশ করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি ঘাঁটি ধ্বংস করেছে ইরান : ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী জানিয়েছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি ঘাঁটি ইরান ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইরানে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।
টেলিগ্রামে দেওয়া পোস্টে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর মধ্যে আবাসিক ভবন, চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ত্রাণকেন্দ্রসহ নানান ধরনের বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। এ স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ রাজধানী তেহরানে অবস্থিত। ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।