ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নাকি সমঝোতার পথে এগোনো হবে, তা নিয়ে দেশটির ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে বাস্তববাদী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতার বিরোধিতা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।


সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ছয় মাসের যুদ্ধের পর ইরানের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন এখন আরও গভীর হয়েছে। এর মধ্যেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি অনুপস্থিত থাকায় দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


প্রথম পক্ষের নেতারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং অবকাঠামোর ক্ষতির মধ্যে শক্তিশালী অবস্থান থেকে এখনই সমঝোতায় যাওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চলতি মাসে বলেছেন, যুদ্ধ কোনো না কোনো সময় শেষ করতেই হবে। তাঁর মতে, ইরান যখন শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্ব তাদের বিজয় স্বীকার করছে, তখনই যুদ্ধ শেষ করা ভালো।


তবে কট্টরপন্থীদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বস্ত মনে করে এবং বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করা। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেও ইরান নিরাপদ থাকবে না।


লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থীরা মনে করছে, যুদ্ধে পরাজিত না হওয়াই তাদের জয়। তারা শুধু ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ভালো চুক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেদের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করতেও চাইছে।


কট্টরপন্থীরা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে দুর্বল নেতা হিসেবে দেখছে। তাদের অভিযোগ, তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে অতিরঞ্জিত করে জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন। এমনকি সরকারের কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।


সমঝোতার বিরোধিতাকারীরা ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া পরমাণু চুক্তির উদাহরণও সামনে আনছে। পরে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান। কট্টরপন্থীদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে ইরান অতীতেও প্রতারিত হয়েছে।


পার্লামেন্টে কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি সমঝোতাপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, তারা জনগণকে একটি চুক্তি ও অপমানজনক শান্তি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছে। তাঁর দাবি, ইরান যত ছাড়ই দিক, যুক্তরাষ্ট্র কখনো সন্তুষ্ট হবে না এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ চাইবে।


এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী অবস্থানও ইরানের কট্টরপন্থীদের অবস্থানকে আরও শক্ত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সানাম ভাকিল বলেন, ট্রাম্প একদিকে ইরানকে আবার মহান করার কথা বলছেন, অন্যদিকে পরের পোস্টেই হুমকি দিচ্ছেন। এতে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে অবিশ্বাস আরও বাড়ছে।


কট্টরপন্থীদের প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদপত্র, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম, রাজপথের বিক্ষোভকারী এবং সামরিক বাহিনীর একটি অংশের ওপরও তাদের প্রভাব রয়েছে। তাদের ধারণা, ট্রাম্প কূটনীতিকে ব্যবহার করে আরেকটি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।


এই পরিস্থিতিতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো কোনো পক্ষের হয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নেননি। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নে কোনো একটি পক্ষকে সমর্থন করলে তাঁর নিজের অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সময়ে তিনি নিজের নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।


শুক্রবার মোজতবা খামেনি সরকারের চাপ মোকাবিলার প্রশংসা করলেও কর্মকর্তাদের দেশের দুর্বলতা নিয়ে প্রকাশ্যে বেশি আলোচনা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে ইরানের শত্রুরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মিত্রদের মনোবল দুর্বল হতে পারে।