গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। সেই হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন সাড়ে ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। যুদ্ধে সরাসরি তিনটি দেশ জড়িত হলেও এর প্রভাব পড়েছে গোটা বিশ্বে। বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণানি বন্ধ থাকায় তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। চাপ পড়েছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতেই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক চেষ্টা শুরু করে। এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতারা সরাসরি বসেও ছিলেন। নানা মহলের চেষ্টায় গত ১৭ জুন ভার্চুয়ালি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। যাতে ফ্রান্সে বসে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ইরানে বসে স্বাক্ষর করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ান। ১৪ দফা সেই সমঝোতা স্মারকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল গোটা বিশ্বের মানুষ। সমঝোতা স্মারকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের অঙ্গীকার ছিল। কথা ছিল, ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ বসে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাবে। প্রয়োজনে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আরেও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। সমঝোতা স্মারকে বেঁধে দেয়া ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ নেই। সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বাড়ানো বা স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো নিয়েও কোনো আলোচনা নেই। বিশাল প্রত্যাশার বিপরীতে বিশ্ববাসীকে চরম হতাশাই উপহার দিয়েছে বহুল আলোচিত এই সমঝোতা স্মারক।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দুদিনের মধ্যে এর নানান শর্ত এবং শব্দচয়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিমত সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিকে ঘিড়ে আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ৩১ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে। তবে চলতি আগস্ট মাসে বড় ধরনের কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। পর্দার আড়ালে সমঝোতার নানা চেষ্টার কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান আর ওমান একটি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সেটি সফল হলে একধরনের স্বস্তি আসতে পারে। যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। তবে দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ের দাবি করছে।
মুখে যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধ বন্ধের মরিয়া চেষ্টা আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বিপুল অর্থ ব্যয় তো আছেই, খবর বেরোচ্ছে টান পড়েছে আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারেও। ইরানের অর্থনীতি তো অনেক দিন ধরেই অবরুদ্ধ। তবু হরমুজ প্রণালিকে মূল অস্ত্র বানিয়ে টিকে থাকাকেই নিজেদের বিজয়ের পর্যায়ে নিয়ে গেছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসার ব্যাপারে ইরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি উল্লেখ করেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে, তবে এর মানে এই নয় যে কোনো আলোচনা চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে আরাঘচি বলেন, আমরা বর্তমানে একটি অস্থায়ী রুট বা পথনকশা করছি, যা পরবর্তী ধাপগুলোতে স্থায়ী রুটে পরিণত হবে। আমরা হয়তো খুব শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করা অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে, যে শর্তগুলো মানতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন, আমেরিকা শিগগিরই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি জানাবে।
১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো দুই দেশের মধ্যকার জটিল ও বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো পরবর্তীতে সমাধানের জন্য তুলে রাখা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং লেবাননের সংঘাত অবসান করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান চলতি যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিচ্ছে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করছে। সেই সঙ্গে লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছিল, চূড়ান্ত চুক্তিতে লেবাননসহ সব ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য ধারাগুলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হবে। সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে এই চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, যা উভয়পক্ষের সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ ছিল, চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্যাকেজের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাজ শুরু করতে হবে। এই চুক্তির অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের তেল রফতানির ওপর ছাড় দেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলারের তহবিলে তেহরানকে প্রবেশাধিকার দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করার এবং ৬০ দিনের জন্য কোনো শুল্ক ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ইরান আরও পুনর্ব্যক্ত করেছিল যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না এবং বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরান লাভবান হচ্ছে এমন আলোচনা শুরু হলেও লাভের মুখ দেখেনি ইরান। সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের একদিনও পার হয়নি, তার আগেই চুক্তির শব্দচয়ন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে, এটি একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি নাকি আরও দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি এবং কোন পক্ষের কী করার কথা ছিল; তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিমত তৈরি হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এই ঘটনার পর উভয়পক্ষই নিজেদের পদক্ষেপের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
গত ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে এই চুক্তিটি ভেস্তে গেছে। জবাবে ইরান জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও স্থগিত করেছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানও একইভাবে নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে। তারপর থেকে, এই যুদ্ধ কোনো শেষ না থাকা এক ইচ্ছাশক্তি এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। কে কতদিন টিকতে পারবে তারই যেন পরীক্ষা হচ্ছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন তিনি আমেরিকাকে কোনো ‘অনন্ত যুদ্ধে’ জড়াবেন না। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মনে হচ্ছে, তিনি সে অঙ্গীকার রাখতে পারছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশলের অংশ। এই মাসের শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন, আমরা কেবল ইরানের বিশাল মুদ্রাস্ফীতি এবং তাদের কাছে কোনো টাকা না থাকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।
তেহরান অবশ্য নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী এবং দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোন কোন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে; তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না করেই তিনি ঘোষণা দেন, আমি আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে ঘোষণা করছি যে আমরা এই যুদ্ধে জিতেছি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্যগুলো নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার মধ্যে ছিল ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, তেহরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র না পায় তা নিশ্চিত করা এবং হিজবুল্লাহর মতো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা। মুখে মুখে যুদ্ধ জয়ের দাবি এবং হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখন কোনোভাবে হরমুজ প্রণালিকে খুলে দিতে পারাকেই নিজেদের বিজয় ভাবছে। আর ইরান অনড় অবস্থানে থাকতে পারাকেই বিজয় বলে ভাবছে।
সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষের দিনে বিশ্বের সামনে একটি বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, যুদ্ধ কি থামবে, নতুন কোনো সমঝোতা হবে নাকি নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু হবে?