যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর গত দুই সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই চলছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। এই পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে একটি বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। 


এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। মে মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় ইরান দাবি করছে, তাদের সীমানার মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রণালিটির চলাচল নীতি তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন দাবি জানাচ্ছে, ইরানকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য এই প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে হবে।


নতুন করে এই সংঘাতের সূচনা হয় গত ৭ জুলাই। ওয়াশিংটন অভিযোগ তোলে, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে তেহরান। এর জবাবে মার্কিন বাহিনী ইরানে শক্তিশালী হামলা শুরু করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে তারা ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে ইরানের গণমাধ্যম জানায়, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় তারা একটি ট্যাঙ্কারে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে তেহরান পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, তাদের নির্ধারিত রুট দিয়েই জাহাজ চলাচল করতে হবে এবং ওমান উপকূল ধরে মার্কিন সমর্থিত রুটটি পুরোপুরি অবৈধ।


মার্কিন এই হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীও নির্ধারক জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসিসি) ও সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা ৮৫টি কী ইউএস মিলিটারি ফ্যাসিলিটিজ বা প্রধান মার্কিন সামরিক স্থাপনায় মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়।


উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি শেষ বলে ঘোষণা করেন এবং ইরানি নেতৃত্বকে নিকৃষ্ট বলে গালি দেন। ১৩ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্প জানান, তিনি সীমাবদ্ধ আত্মরক্ষামূলক হামলা আবার শুরু করেছেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প তেহরানকে হুমকি দিয়ে বলেন, মার্কিন দাবি না মানলে পাওয়ার প্ল্যান্ট ও ব্রিজের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা সম্প্রসারিত করা হবে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আদায় করবে। নিজেকে তেহরানের “এক নম্বর টার্গেট” হিসেবে উল্লেখ করে তিনি হুমকি দেন, ইরান যদি তাকে নিশানা করে তবে দেশটিকে “সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস” করে দেওয়া হবে।


যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে তেহরান একে মিথ্যা অজুহাতে সন্ত্রাসী মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসী হামলা বলে অভিহিত করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ বলেছেন, সমঝোতা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার জন্য ওয়াশিংটনকে মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। 


আইআরজিসি তাদের এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আমাদের ভূখণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে তাদের অবৈধ সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে, তবেই এই পথ উন্মুক্ত থাকবে। মার্কিন হামলার প্রতিবাদে তেহরান প্রণালীটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর এই পথে ট্যাঙ্কার চলাচল গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন হামলার জবাবে তেহরানের কাছে যুদ্ধ তীব্র করার এমন পরিকল্পনা রয়েছে যা পুরো চমকে ভরা। তিনি আরও সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের অংশ হিসেবে বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার ধারা অব্যাহত রাখে, তবে পুরো অঞ্চলকেই এর মূল্য দিতে হবে।


এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে চার মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তবে মার্কিন বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, জর্ডানে ইরানি হামলায় বহু মার্কিন সেনা আহত হওয়া এবং হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পেন্টাগন গোপন করছে। অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্যানুযায়ী, ইরানে মার্কিন হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।


সংঘাতের পারাপারে জ্বালানি তেলের বাজার মারাত্মকভাবে উদ্বেলিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দাম এক ধাক্কায় ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।


এই চরম পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে একে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। পাকিস্তান দুই পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়ে বিশ্বশান্তির স্বার্থে মধ্যস্থতার আশ্বাস দিয়েছে।


এদিকে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে কৌশলগত নৌ অবরোধ ঘোষণা করায় বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।


সর্বশেষ মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনার বরাতে বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের লাগাতার সামরিক আক্রমণ সত্ত্বেও তেহরান তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটবে না, যার ফলে উভয় দেশ এখন যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এক অনির্দিষ্ট অবস্থায় আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে বলে খবর এসেছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও ধ্বংসাত্মক সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।