যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক ও ড্রোনঘাঁটি লক্ষ্য করে লাগাতার বিমান হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে পাল্টা হামলায় জর্ডানের ঘাঁটিতে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান এ যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এতে অর্থসংকট তৈরি হয়েছে।


গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র টানা ১১ রাত ইরানের সামরিক অভিযান পরিচালনা কেন্দ্র এবং লজিস্টিক অবকাঠামোয় বিমান হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেন্টকম এ অভিযান পরিচালনা করে। অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর ইসা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরান জানিয়েছে, আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাল্টা আক্রমণ চলবে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে তেহরান। ওয়াশিংটনও হামলার পাশাপাশি আলোচনার কথা বলছে। গতকাল সকালে ইরানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়, জর্ডান ও বাহরাইনে আল-আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর আবাসন, সামাজিক কল্যাণ ভবন এবং সরঞ্জাম ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে আর্শ ড্রোন ব্যবহার করে ভারী বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কর্মশালা এবং বড় ধরনের সরঞ্জাম ডিপোতে আঘাত হানা হয়েছে। ইরানি সেনাবাহিনী বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে দক্ষিণ ইরানের জনগণের প্রতি উৎসর্গ করা এ অভিযানটি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।


এ ছাড়া একটি পৃথক অভিযানে বাহরাইনে অবস্থিত অ্যামাজন ডেটা সেন্টারের মূল অবকাঠামোয় আঘাত হেনেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ‘অপারেশন নাসর ২’-এর ২৪তম তরঙ্গের অধীনে পরিচালিত এ হামলায় ‘এমই-সাউথ-১’ নামের ক্লাউড সেন্টারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইআরএনএর তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে মধ্যপ্রাচ্যে চালু হওয়া এ সেন্টারটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৯ বিলিয়ন ডলারের ‘জয়েন্ট ওয়ারফাইটিং ক্লাউড কেপাবিলিটি’ চুক্তির অধীনে এ ডেটা সেন্টারটি পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক তথ্য বিশ্লেষণের কাজ পরিচালনা করত বলে ইরানের দাবি। পাশাপাশি কুয়েতের পশ্চিমে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যতম বৃহত্তম লজিস্টিক হাব দোহা ক্যাম্পেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীর গোলাবারুদ ডিপো এবং লজিস্টিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের কোনো বৈরিতা নেই; কেবল ইরানে মার্কিন আগ্রাসন ও অপরাধের জবাব হিসেবেই এসব মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অন্যদিকে টানা ১১ দিন ইরানে বোমাবর্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। সেতু, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরের মতো দেশটির জরুরি পরিকাঠামোর ওপর এ হামলা হচ্ছে। মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আরও এক মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং মার্কিন মিত্র দেশ কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইনের ওপর তেহরানের হামলার জবাব দিতেই এ বোমাবর্ষণ। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানি আক্রমণ রোখাও এ হামলাগুলোর লক্ষ্য। এ বিষয়ে সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যতবার ইরান একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা করবে, ততবারই তাদের সেই হত্যার জন্য বহুগুণ মূল্য চোকাতে হবে। তবে আলোচনার পথও খোলা রাখা হয়েছে।’


ইরানের হুঁশিয়ারি : ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর সতর্ক করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তা আঞ্চলিক যুদ্ধের আরও বিস্তার হিসেবে বিবেচিত হবে। উল্লেখ্য, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোতে হামলার হুমকি দেয়। আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, আগ্রাসি ও সন্ত্রাসী মার্কিন বাহিনী যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইরান সেটিকে যুদ্ধের নতুন পর্যায় হিসেবে দেখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র এবং সমর্থকদের সব ধরনের স্বার্থে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।


লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে সতর্কতা : ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আপাতত লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নৌবাহিনী অ্যাসপাইডেস।


 শিপিংশিল্পের জন্য জারি করা এক পরামর্শে অ্যাসপাইডেস জানায়, হুমকির মাত্রা কমে না আসা পর্যন্ত ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার না করাই নিরাপদ।


এদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ঘোষণা দিয়েছে, তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করা শুরু করেছে। হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে হুতিদের এ নতুন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


যুদ্ধে মার্কিন ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট সামরিক ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের শুনানিতে এ হিসাব তুলে ধরে জানান, মে মাসের সর্বশেষ হিসাবের তুলনায় এ ব্যয় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। তবে মুডিস অ্যানালিটিকসের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ যুদ্ধের পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; যা মার্কিন অর্থনীতিতে বিরাট সংকট তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি স্বীকার করছে।