দেশে প্রকৌশল শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়লেও বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার অবস্থান এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে—এমন চিত্রই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে।


বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মোট ১৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে—এর মধ্যে ৫৭টি সরকারি ও ১১৬টি বেসরকারি। তবে ১৬৩টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৫টি পাবলিক ও ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল অনুষদ রয়েছে।


এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশল শিক্ষা চালু থাকলেও আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে দেশের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশের মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সীমিত গুরুত্ব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই এর প্রধান কারণ।


যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ‘কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস’ (কিউএস) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৬ অনুযায়ী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকাভুক্ত হয়েছে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এদের অবস্থান যথাক্রমে ১০০ ও ১২৬। এ র‍্যাংকিং নির্ধারণে এমপ্লয়াবিলিটি, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


বর্তমানে দেশে প্রকৌশল শিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারের বেশি এবং বছরে প্রায় ৫০ হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত ল্যাব, শিক্ষক এবং স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কয়েকটির এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানে ল্যাব ও অধ্যাপক সংকট প্রকট।


নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘আমাদের প্রকৌশল শিক্ষা মূলত একাডেমিকভাবে দক্ষতা তৈরিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একটি আইডিয়াকে মার্কেটাইজ করা বা প্যাটেন্টেবল পণ্যে রূপান্তরের যে “প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট” সংস্কৃতি আইআইটি বা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে, তা আমাদের এখানে অনুপস্থিত। ইনোভেশন ও প্যাটেন্ট সংস্কৃতির অভাবে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।’


দেশের শিক্ষার্থীরা একটি যন্ত্র পরিচালনা করতে শেখে কিন্তু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হয় কীভাবে সেটি শেখার সুযোগ সেভাবে পায় না জানিয়ে ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়গুলো পড়ানোর কথা ছিল কিন্তু এখন বেশির ভাগই ঢালাওভাবে সাধারণ বিষয় (জেনারেল সাবজেক্ট) যুক্ত করায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশেষত্ব হারাচ্ছে। আবার সীমিত বাজেটে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’


শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের প্রকৌশল শিক্ষা এখনো মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর। উদ্ভাবন, পেটেন্ট বা পণ্য উন্নয়নভিত্তিক শিক্ষা সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষার্থীরা যন্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্বল ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ এবং ল্যাবরেটরির মান উন্নয়নে ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করা হয়।


কিউএস র‍্যাংকিংয়ের এমপ্লয়ার রেটিং সূচকে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর যথাক্রমে ৬০ ও ৫৭ দশমিক ৪। অন্যদিকে ভারতের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এ সূচকে অনেক এগিয়ে রয়েছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় প্রকৌশলীদের নেতৃত্বের উপস্থিতিও এ পার্থক্যকে স্পষ্ট করে।


বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল, মাইক্রোসফট ও আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা ভারতীয় প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক হওয়াও এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি দেশের প্রকৌশল শিক্ষাকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে।


টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৬ র‍্যাংকিংয়েও প্রকৌশল বিষয়ে বাংলাদেশের মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষে এবং বুয়েট দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে অধিকাংশ সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোর তুলনামূলকভাবে কম, বিশেষ করে গবেষণার পরিবেশ ও শিক্ষার পরিবেশে দুর্বলতা স্পষ্ট।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পুরনো হলেও প্রকৌশল অনুষদ খুব বেশি দিনের নয়। এর পরও আমরা যথেষ্ট ভালো করছি। বিশেষত আমাদের বাজেট এবং সুযোগ-সুবিধার যে পরিস্থিতি সেটি যদি বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে এটি বলা যায় যে এত অল্প দিয়ে আমাদের চেয়ে ভালো করছে এমন প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। আবাসন ও মানসম্মত খাবারের যে মৌলিক চাহিদা, আমরা শিক্ষার্থীদের সেটিই পূরণ করতে পারি না। ল্যাবগুলোয় আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, একেকটা গবেষণা প্রজেক্টে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা অতিস্বল্প। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় আরো ভালো করতে হলে এ সংকটগুলো আগে নিরসন করতে হবে, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) বাস্তবায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পখাতকে গবেষণায় সম্পৃক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব স্থাপন প্রয়োজন।


এদিকে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ হওয়ায় প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।


সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণা-উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরাও বৈশ্বিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।