অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের জন্ম দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে গতকাল রাতে ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। বিকালে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন-এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে রাত ৯টার পর থেকে। এরপর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পদত্যাগের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাত ১০টার দিকে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেন, তিনি পদত্যাগ করেননি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবর সঠিক নয়। তিনি এসব গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। একই সময়ে প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে পদত্যাগের বিষয়টিকে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক আখ্যা দিয়ে সংবাদটি গণমাধ্যমকে প্রত্যাহার করে নিতে বলা হয়। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।


এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানায়, গতকাল সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে নিজের দপ্তরে ডেকে নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের কারণে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। এমনকি ক্ষুব্ধ হয়ে পদত্যাগ করারও নির্দেশ দেন। পরে পাশের একটি কক্ষে বসে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগপত্রের খসড়াও তৈরি করেন। এরপর তিনি সেটি জমা দিয়েছেন কি না, কিংবা প্রধানমন্ত্রী এ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন কি না সে বিষয়টি সূত্র নিশ্চিত করেনি। অথবা পদত্যাগপত্র আজ কিংবা কালের মধ্যে জমা দেবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী যে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


জানা যায়, শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভিতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার এক দিনের মাথায় ইশরাককে মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী।


সরকার সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকবিরোধী উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার বিষয়টি কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন, সেই প্রশ্ন ওঠে। একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকান্ড সরকারকে বিব্রত করেছে। ফলে ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ মন্ত্রিসভাকেও চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে মনে করছে সরকার। 


উল্লেখ্য, শনিবার বিকালে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ান। তাদের একজন এক তরুণকে লাথি মারেন।


এদিকে গত রাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়ে তাঁর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ সংক্রান্ত অসত্য ও বিভ্রান্তিকর খবরের প্রতিবাদ’ জানান। বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, রবিবার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ‘পদত্যাগ’ বা ‘তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’ মর্মে যে সংবাদটি প্রচারিত হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রকৃত সত্য এই যে, প্রতিমন্ত্রী তাঁর সরকারি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে পদত্যাগের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি এবং তাঁর পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং জনসাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এ ধরনের কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।


গত শনিবার নিজ সংসদীয় আসনে মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেবল আত্মরক্ষার্থে আইনসম্মতভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের যে ঘটনাটি ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ইতিপূর্বেই তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এ ঘটনা কেন্দ্র করে তাঁর পদত্যাগ সংক্রান্ত যে কোনো খবর ছড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি ও সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী। আমরা সংশ্লিষ্ট সব গণমাধ্যম ও দেশবাসীকে এ ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে, যেসব মাধ্যম এ বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ করেছে, তাদের অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করে সঠিক তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


যে ব্যাখ্যা দিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক : মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে থাকা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, অস্ত্র নিয়ে কাউকে ভয় দেখাননি, গুলিও করেননি। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্রেফ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ইশরাক হোসেন বলেছেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি ছিল বৈধ। তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। তাঁর সংসদীয় আসনের মধ্যে গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুন্টিঘর এলাকায় মাদক ব্যবসা হয়। এ নিয়ে এলাকার মানুষ বারবার তাঁর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানানোর পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে গেছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুলিশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ বিষয়ে তিনি অন্তত ৩০ থেকে ৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে পুলিশ একেক সময় একেক কথা বলেছে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই-এ ধরনের কথা বলা হয়েছে। এর আগে ওই এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উল্লেখ করে ইশরাক হোসেন বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে। এ কারণে তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই। হ্যাঁ, অভিযান আমরা করেছি, আমরা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছি। যাতে করে দ্বিতীয়বার আর মাদকের আস্তানা গড়ে তুলতে না পারে।’


আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা, বলল ডিবি : মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনের পিস্তল হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি মূল্যায়ন না করে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবেন। সেখানে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আইনগত ব্যবস্থা নেবে। একজন প্রতিমন্ত্রী পুলিশের মতো দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।