নারীকাণ্ডে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচিত ঘটনার সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বহিষ্কারের বিষয়টি অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে গাজী নজরুল ইসলামকে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে তাঁর নির্বাচনি এলাকা শ্যামনগরে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৯৯১, ২০০১ ও ২০২৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম। বহিষ্কারের আগে দলের সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ছিলেন।
গতকাল বিকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিষয়গুলো নিয়ে দলীয় তদন্ত পরিচালিত হয়। সেই তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে জানানো হবে।
গত সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। এমপির নারীকাণ্ডের খবরে জামায়াতে ইসলামীর ভিতরও তোলপাড় হয়। মঙ্গলবার গাজী নজরুল ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। ১৭ জুন তাঁরা বিয়ে করেছেন বলে ফেসবুক পোস্টে জানান। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দল কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে গতকাল প্রতিবেদন নির্বাহী পরিষদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিকালে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে এর আগে গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নারীকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি তাঁর বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের এবং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সদস্যপদের বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদে আসন শূন্য হওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- কোনো দল থেকে মনোনীত কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ বা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। দল থেকে বহিষ্কার হলে আসন শূন্য বা সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কথা উল্লেখ নেই পাওয়া যায়নি। তবে ফৌজদারি মামলায় তিনি যদি এমনভাবে দণ্ডিত হন, যাতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এর একাংশে উল্লেখ আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে ওই ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন। এদিকে জামায়াত বহিষ্কার বার্তায় বলেছে, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে এবিষয়ে কোনো পক্ষ থেকে মামলা হয়নি।
এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে শুধু দল থেকে পদত্যাগ ও দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর কথা বলা হয়েছে। এখানে বহিষ্কারের কথা উল্লেখ নেই। তিনি আরও বলেন, বহিষ্কারের কথা উল্লেখ থাকলে দলীয় প্রধানের প্রতি অতি আনুগত্য দেখাতে সদস্যরা বাধ্য থাকতেন। সে কারণে হয়তো বহিষ্কারের কথা সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ঋণ খেলাপিসহ অন্য যেসব কারণে সংসদ সদস্য পদ যেতে পারে এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আবার নৈতিক স্খলের বিষয়টিও আইনে সরাসরি অপরাধ নয়।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভোটাররা সংশ্লিষ্ট দলের মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রার্থীকে ভোট দেন। ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পর ওই সদস্যের পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। তিনি বলেন, অতীতে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রেও এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে একটি মামলায় আদালত স্পিকারকে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন তিনি সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে, না।’
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, এ সংক্রান্ত দলীয় চিঠি পেলে করণীয় বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে কমিশন সভায়। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চিঠি আসুক, তারপর দেখা যাবে। বরাবরের মতো সংসদ সদস্যের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্পিকারের থেকে চিঠি পাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকবে ইসি। এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ সংক্রান্ত চিঠিটাও আসতে হবে পার্লামেন্ট থেকে।
পূর্বের নজির :
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গোলাম মাওলা রনি। পরে আওয়ামী লীগ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তবে গোলাম মাওলা রনির সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল এবং তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ মেয়াদের স্বাভাবিক সমাপ্তি টানেন। এদিকে ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যখন আইনি শুনানির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে বক্তব্য দিয়ে নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে ইসির কোনো আইনি আদেশে নয়, নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে তাঁর আসন শূন্য হয়।
অন্যদিকে ২০২১ সালে ফোনকল কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় ডা. মুরাদ হাসানকে। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগও তাঁকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়। তিনিও গোলাম মাওলা রনির মতো নিজের পুরো মেয়াদই পার করেন সংসদ সদস্য হিসেবে।
ধর্ষক ঘোষণা দিয়ে শ্যামনগরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা : সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে শ্যামনগরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে বক্তারা এমন দাবি জানান।
এদিকে নারীকাণ্ডে এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কয়েক শ নারী ও পুরুষের একটি মিছিল পৌর সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা হাতে ঝাড়ু ও জুতা নিয়ে নজরুল ইসলামের ছবিতে আঘাত করতে থাকে। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।
বিক্ষোভ মিছিল শেষে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সুলাইমান কবিরের সভাপতিত্বে উপজেলা প্রেস ক্লাব চত্বরে আয়োজিত পথসভায় বক্তারা গাজী নজরুল ইসলামকে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে তাঁর শাস্তির দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, ১৩ জুলাইয়ে ঘটনাটি ঘটলেও গাজী নজরুল ইসলাম কৌশলে তা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলেন। নজরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগীরা ওই তরুণীকে বিয়ের নাটক সাজিয়েছেন।
বহিষ্কৃত জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে গাড়িচালকের মামলা এক আসামি কারাগারে : বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম কামাল উদ্দীন আসামি আমিনুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেন। আমিনুর রহমান মামলার বাদী ওবায়দুর রহমানের চাচাতো ভাই। মামলার অপর আসামিরা হলেন গাজী নজরুল ইসলাম (৭৪), মাসুম বিল্লাহ (৪১), মোতাসসিম বিল্লাহ (২৫) ও রাকিবুল হাসান (৩০)। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
এজাহারের বিবরণে বলা হয়েছে, বাদী গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগ্নির অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুর তার পরিবারকে জানান এবং নজরুল ইসলামকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ইসলাম তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।