দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীন বিএনপির হাইকমান্ড। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব অভিযোগ ওঠায় কেন্দ্র থেকে একের পর এক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ভাঙচুরের অভিযোগ শুধু সাংগঠনিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তি এবং জন-আস্থার বিষয় যুক্ত বলে মনে করেন হাইকমান্ড। তাই শোকজ, কমিটি বিলুপ্তি, বহিষ্কার, আইনগত ব্যবস্থা-সব মিলিয়ে দলীয় পরিচয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। শৃঙ্খলা রক্ষায় হাইকমান্ডের নজর এখন রাজধানী থেকে তৃণমূল সর্বত্র। কেন্দ্রের কঠোর নির্দেশনা জেলা, মহানগর,  উপজেলা, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কতটা কার্যকর করা যায়, সেটিই বড় পরীক্ষা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মোটাদাগে বলা যায়, বিএনপি হাইকমান্ডের নজর এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত। হাইকমান্ডের এই কঠোর অবস্থানকে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সাধুবাদ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তাঁরা অবশ্য এও বলেছেন, এ কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নানান চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুট ও ভাঙচুরের ঘটনা বিএনপির জন্য নতুনভাবে অস্বস্তি তৈরি করে। ঘটনার পর ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্তসহ উত্তর যুবদল ও মহানগরী পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতা বহিষ্কারের ঘটনা দলীয় শৃঙ্খলা ফেরানোর হাইকমান্ডের কঠোর বার্তা। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, হাইকমান্ডের নজর তৃণমূলেও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগর কৃষক দলের কমিটি বিলুপ্ত করার ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো থেকে দলীয় হাইকমান্ডের অবস্থানের একটি বিষয় স্পষ্ট, তা হচ্ছে-স্থানীয় পর্যায়ের কোনো কমিটি বা নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা পুরোপুরি স্থানীয় নেতৃত্বের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ খোলা রাখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ উঠলে স্থানীয় নেতৃত্ব ধামাচাপা দিতে ভয় পাবেন। তাঁরা মনে করবেন, বিষয়টি নিয়ে গড়িমসির কারণে কেন্দ্র থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত এলে তাঁরাও রেহাই পাবেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ। দলীয় সূত্র জানায়, তৃণমূলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষ ও প্রভাবশালীদের নিজস্ব বলয় রয়েছে। এসব বলয়ের সঙ্গে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে জটিল। ফলে কোনো নেতার বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি বা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠলে শুধু বহিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ যাচাই, আইনগত ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে এ কারণেই এখন বড় প্রশ্ন-কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে কি না? আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগের রাজনৈতিক অপব্যবহার ঠেকানো। সূত্রমতে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলতে পারে। তাই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে দখল-ভাঙচুরের বিরুদ্ধে বিএনপির হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থান এখন আর শুধু কেন্দ্রীয় ঘোষণার বিষয় নয়; এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তৃণমূলের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ-একদিকে দখল, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া; অন্যদিকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের মাঠের কর্মকাণ্ডে।


এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিএনপির ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা লোকগুলোই অনিয়ম করে দল ও দেশের ক্ষতি করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা দেশবাসী সাদরে গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা আমরা তৃণমূলে বাস্তবায়ন করব। অপরাধীদের কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না।’ বিএনপি চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারেক রহমান দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছেন। এখন হচ্ছে “অ্যাকশন”। আর এই অ্যাকশন অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপি মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারেক রহমান বর্তমানে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে বৈচিত্র্য রয়েছে।’


যা বলছেন তৃণমূল নেতারা : অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দলীয় হাইকমান্ডের জিরো টলারেন্টের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা। তাঁরা বলছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে এ অবস্থান কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূলেও বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বিষয়ে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী দলীয় পরিচয়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আখের গোছানোর চেষ্টা করছে। এরা দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সাধারণ মানুষেরও বিএনপির প্রতি আস্থা বাড়বে।’


বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন বলেন, ‘চাঁদাবাজদের কোনো দল নেই। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা নেয়, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়া উচিত।’ বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘আইনের চোখে সবাই সমান। বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত, তাই দায়িত্বও বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে স্বাগত জানাই।’ দিনাজপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোকাররম হোসেন বলেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলায় চাঁদাবাজি-মাদক-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বলবৎ রয়েছে।’ ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ এমপি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রজিরো টলারেন্স অবস্থান তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সুস্পষ্ট বার্তা-দল করতে হলে দলের নিয়মশৃঙ্খলা মেনেই করতে হবে।’ নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘দেশের মানুষকে ভালো রাখার জন্য দল যে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা তার প্রতি অনুগত থাকব। যাদের অপকর্মে দল ও রাষ্ট্রের বদনাম হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থে চলমান অবস্থান চালু রাখতে হবে।’ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু বলেন, ‘দুর্নীতি ও রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে না।’ গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ কে এম ফজলুল হক মিলন এমপি বলেন, ‘হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত জাতির কল্যাণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য এবং যে কমিটমেন্ট দিয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তা রক্ষার জন্যই এই কাজ করেছেন বিএনপি হাইকমান্ড।’


খুলনা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, ‘যারা বিশৃঙ্খলা করবে এবং দলকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করবে তাদের বিরুদ্ধে বিএনপি কঠোর অবস্থানে থাকবে।’ খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘এটা সতর্কবার্তা। ভোটের মর্যাদা রক্ষা করতে দল যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’


যা বলছেন অঙ্গসংসঠনের নেতারা : জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ন্যূনতম কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ নীতির আলোকেই ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা শাখার বেশ কয়েকজন নেতাকে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘যুবদলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো ধরনের অন্যায় বা চাঁদাবাজি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান জাফির তুহিন বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’