আজ ঐতিহাসিক ১২ ফেব্রুয়ারি। ১৮ কোটি মানুষের প্রতিক্ষিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ উন্মুক্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আজকের এ সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মোড় ও আপামর জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে ইচ্ছেমতো ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য সারা দেশের ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। দেশকে শোকসাগরে ভাসিয়ে আপসহীন এক দেশনেত্রীর মহাপ্রয়াণ ও আরেক নেত্রীর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর নেত্রীবিহীন এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির কর্ণধার তারেক রহমান নিজেই দেশবাসীর ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থাশীল ও বিশ্বাসী। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ের ব্যাপারে এ আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক আসন আমাদের থাকবে। ইনশাআল্লাহ আমরা মেজরিটি পাব এবং বিএনপিই সরকার গঠন করবে।’ একই বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ নির্বাচনে তাঁর দলের পক্ষে ভূমিধস বিজয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, গণতন্ত্রের উত্তরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এ নির্বাচন হলো ‘গেট ওয়ে’। এ গেটওয়ে পার হলে আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশে ফিরে যেতে পারব। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই এ নির্বাচনকে আমরা অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।


এদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের সদস্যদের প্রত্যাশা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে দলটি। তবে নির্বাচন ও ভোটের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ দলটি। ভোট কেন্দ্রে যে কোনো রকমের কারসাজি, জালিয়াতি কিংবা ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক রয়েছে দেশের বৃহত্তম এ রাজনৈতিক দলটি।


‘তারুণ্যের প্রথম ভোট হবে ধানের শীষে’- এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বিএনপি নেতারা বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও তারুণ্যের প্রতীক। সমাজে তরুণদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন- অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাঁর দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষ দল বা জোটের পক্ষ থেকে একটি ভালো বিরোধী দল পাবে দেশের মানুষ।


বিশেষ করে গতকাল ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লার মুরাদনগর ও চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের কাছে বিতরণের সময় বিপুল পরিমাণের টাকা নিয়ে জনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ধরা পড়েছেন। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এত পরিমাণের কালো টাকার ছড়াছড়ির মাঝে কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব? এসব অনিয়মের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নির্বাচনে কালো টাকাসহ জামায়াত নেতাদের ধরা পড়ার বিষয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যাদের নীতি-কথায় আমরা আপ্লুত হই, তাদের নেতাদের এহেন ‘কালো টাকা বহন ও বিতরণের’ কর্মকা দেখে আমরা বিস্মিত। ধর্মের দোহাই দিয়ে এত কথাবার্তা শুনলাম, আর শেষ পর্যন্ত এই ছিল তাদের মনে? আশা করি, দেশের জনগণই বিচার করবেন এবং তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। দেশ ও মানুষকে বাঁচাতে ধানের শীষকেই মানুষ বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন বলে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী নজরুল ইসলাম খান।


বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের সদস্যরা বলছেন, নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় লাভের বিষয়ে তারা আশাবাদী। অর্থাৎ ২ শতাধিক আসনে জয়লাভের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারা। এ নির্বাচনে ২৯২টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাকি আসনগুলোতে তাঁদের জোটের শরিক ও সমমনা দলের প্রার্থীরা লড়ছেন।


বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এবারের নির্বাচনকে বিএনপি অনেক সিরিয়াসলি নিয়েছে। দলীয় প্রধান সারা দেশের পথসভাগুলোতে বক্তব্য রাখায় দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা আরও উজ্জীবিত হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও ধানের শীষকে জয়ী করতে ভোট দেওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সারা দেশে বিএনপির পক্ষে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও জরিপের ফল এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা- সবকিছু মিলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় অনিবার্য।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ গণতন্ত্রের উত্তরণে বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে। আজ ইনশাআল্লাহ আমরা তার প্রতিফলন দেখব। আমরা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন দেখেছি। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯০-এর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনতার বিপ্লবের ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখেছি। এবার আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে পুনরায় গণতন্ত্রের উত্থান দেখব ইনশাআল্লাহ।


গণভোট প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান : বিএনপি গণভোটে ‘হ্যা’-এর পক্ষে। জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি জনগণের মাধ্যমে নির্ধারিত হোক, সেটাই বিএনপির প্রস্তাব ছিল এবং এখনো সেই অবস্থানেই আছে দলটি। ?নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে জনগণই। পরিবেশ ও মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি আশাবাদী। এ প্রসঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি একটি ভূমিধস বিজয়ের দিকে এগোচ্ছে। এ মুহূর্তে যে ধরনের নির্বাচনি পরিবেশ থাকার কথা, আমার মতে বাংলাদেশে সেই পরিবেশই বিরাজমান রয়েছে। ?কিছু রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক থাকবেই। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। নির্বাচনি মাঠে তর্কবিতর্ক না থাকলে নির্বাচনের আমেজ আসে না। তবে কোথাও কোথাও এর ব্যতিক্রম কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে। এসব ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।


সব জরিপেই এগিয়ে বিএনপি : সাম্প্রতিক সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ নির্বাচন ও ভোট নিয়ে যত রকমের জরিপ হয়েছে সব জনমত জরিপেই বিএনপি জয়ী হওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। তবে তাদের জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলেও দু-একটি জরিপে এসেছে। অন্যদিকে তরুণদের নেতৃত্বে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা জেন-জিদের দল (এনসিপি) জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি ঐক্যে যুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি নেতাদের মাথাগোঁজার ফলে বেশির ভাগ জেন-জি সদস্যের মাঝে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এ নতুন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীদের প্রতি বিরূপ ধারণাও তৈরি হয়েছে।


আত্মবিশ্বাসের মধ্যেও আছে উদ্বেগ-আশঙ্কা : নির্বাচনে আত্মবিশ্বাসী হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে ভোট ও ফলাফলের বিষয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। খোদ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই সম্প্রতি তার প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় পরিষ্কারভাবে বলেছেন, এ নির্বাচন নিয়ে একটি মহল তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। এ চক্রান্তের বিষয়ে দলীয় নেতা-কর্মী ও জনসাধারণকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এমনকি ষড়যন্ত্র রুখতে ভোটের দিন ভোরবেলায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছেন তারেক রহমান।


বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন গতকাল বলেন, নির্বাচনি প্রচারণায় সারা দেশে যে গণজোয়ার দেখা গেছে, তাতে বিএনপির বিজয় ইনশা-আল্লাহ অনিবার্য। সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ রয়েছে। আশা করি, সবাই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়ে বিএনপির নাম কখনো আসেনি। তিনি গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নানাভাবে জালভোটের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। গতকাল বুধবার ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে এই দলের নেতারা টাকা বিতরণ করতে গিয়ে ধরাও পড়েছেন।


বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির সরকার গঠনের ব্যাপারে কোনো আশঙ্কা নেই। তবে অনেক এলাকাতেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিপক্ষ কীভাবে সেই ইঞ্জিনিয়ারিংটা করবে তা তো আমাদের জানা নেই। সেজন্য আমাদের সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।


বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা আশা করি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। তবে সবাইকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। যাতে ভোট নিয়ে কোনো ধরনের জাল-জালিয়াতি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।