বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেলসংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনার পথ আপাতত বন্ধ। দুই দেশের মাঝে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল এবং ভারতীয় অর্থায়নে চলমান প্রকল্প নিয়ে আলোচনার পথও বন্ধ হচ্ছে। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই ভোটের আগে ঘুরছে না রেলের চাকা।
এ ব্যাপারে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে বৈঠক হবে না, পরে কীভাবে হবে এসব নিয়ে নতুন করে ভাবার কিছু নেই। সবকিছু মিলিয়ে আন্তঃসরকার বৈঠকের পরিস্থিতি নেই। যা হবে সব ভোটের পর। আপাতত সবকিছু বন্ধ থাকবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার এই বৈঠক করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। চলতি জানুয়ারিতে বৈঠকটি ঢাকায় অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। আগের বৈঠকটি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে হয়েছিল। প্রথা অনুযায়ী এবারের বৈঠক ঢাকায় হওয়ার কথা। কিন্তু বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন, ভোটের আগে আর আন্তঃসরকার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই থেকেই নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। আসন্ন আন্তঃসরকার বৈঠক কেন্দ্র করে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে তৃতীয়বারের মতো চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরকার সরে এসেছে। আপাতত ট্রেন চালানোর ইস্যুতে কোনো চিঠি দেওয়া হচ্ছে না। ট্রেন চলাচলের বিষয়েও নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে তাই ভোটের আগে চিঠি নয়।
ভারতীয় অর্থায়নে রেলে ছয়টি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প চলমান ছিল। এর মধ্যে তিনটিতে ভারত ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। যার দুটি আবার একেবারে বাতিল করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আর একটি প্রকল্পের জন্য বিকল্প অর্থায়ন প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে আশার কথা, দুই দেশের মাঝে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল এখনো স্বাভাবিক আছে। ট্রেন চালাতে এখনই ভারতকে চিঠি দিচ্ছে না বাংলাদেশ : দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় রেল যোগাযোগব্যবস্থাসংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ৩৮তম ‘ইন্ট্রা-গভর্নমেন্ট রেলওয়ে মিটিং’য়ের (আইজিআরএম) প্রস্তুতিমূলক সভায় ট্রেন চালানোর বিষয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ রেলওয়েতে আন্তঃসরকার বৈঠকের আলোচ্য সূচি নিয়ে প্রস্তুতিমূলক ওই সভা হয়। পরে ২৩ অক্টোবর সভার কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করে তাতে স্বাক্ষর করেন রেল সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তদেশীয় মৈত্রী, মিতালি ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালু করার বিষয়ে আগের চিঠির ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আবারও চিঠি দেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র পরিবহনের জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর কথা। আর রাজশাহী-কলকাতা রুটে ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে চিঠি দেবে রেলওয়ে। এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচলের পথ বদল করতে চায় রেলওয়ে। নতুন পথে পদ্মা সেতু ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের।
তাই পদ্মা সেতু দিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর কথা ছিল রেলওয়ের। এ প্রস্তাবে রাতের বেলা ট্রেন পরিচালনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হতো। একই সঙ্গে আপ লাইনে ক্রস ওভার তৈরির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো। এখন এসবের কিছুই আর হচ্ছে না।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছেন, যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর বিষয়ে গত বছরের আগস্টে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কয়েকবার অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় যোগাযোগ করে। তবে তাতে সায় দেয়নি ভারত। এরপর ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন বিভাগের এক চিঠির বিপরীতে পণ্যবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে অনুমতি দেয় ভারত। ওই রাতেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে অনাপত্তি পায় বাংলাদেশ। এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী মিতালি এক্সপ্রেস, মৈত্রী এক্সপ্রেস ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চলাচলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়।