মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আলোচনা ব্যর্থ হলে ‘পূর্ণাঙ্গ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। অন্যদিকে, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছে ওয়াশিংটন। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে।
সোমবার রয়টার্সকে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে তেহরান আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থান নেবে। একই সময়ে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, বর্তমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তারা আগ্রহী নয়।
শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়া এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ থেমে যাওয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
তেলের বাজারে নতুন চাপ
সোমবার ৩০ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার আরও ২৭ সেন্ট বা ০.৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ১৪ ডলারে লেনদেন হয়।
অন্যদিকে, মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ৪২ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ০৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এর দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ৮৫ দশমিক ৩৭ ডলারে উঠেছিল, যা ৩১ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।
কেসিএমের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক আরও নাজুক হয়ে পড়ায় সপ্তাহের শুরু থেকেই তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে এখনো কোনো চুক্তির লক্ষণ নেই। একই সঙ্গে ওই জলপথে জাহাজ চলাচলও অত্যন্ত সীমিত।
কেপলারের জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারে হামলার পর শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে। রোববার কোনো জাহাজই প্রণালিটি অতিক্রম করেনি। এর আগের সপ্তাহান্তে এই সংখ্যা ছিল ৩১টি।
ওয়াটারার বলেন, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে একই সময়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, বর্তমান সরবরাহ-ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এই দুই জলপথ।
হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা
হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান আলাদাভাবে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের দাবি, দুই দেশ এ বিষয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে এই উদ্যোগের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানের বিরুদ্ধে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওমান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার হওয়ায় এমন হুমকি কূটনৈতিকভাবে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক তৎপরতায় কিছুটা আশার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে গোপন আলোচনা শুরু করেছে।
হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরেও উত্তেজনা
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে অস্থিরতার মধ্যে ইয়েমেনের হুথিরাও নতুন হামলার দাবি করেছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি সৌদি সামরিক জাহাজ ও চারটি এসকর্ট জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর থেকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। আর বাব এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে দুই জলপথে একযোগে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, সোমবার রয়টার্সের একটি প্রাথমিক জরিপে ধারণা করা হয়েছে, গত সপ্তাহে পণ্য মজুদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুদও কমেছে। সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মজুদ কমার এই পূর্বাভাসও তেলের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ এখনো স্পষ্ট নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া, ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।