গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া অর্থকে ‘লভ্যাংশ’ দেখিয়ে সরকারের ন্যায্য রাজস্ব ফাঁকি দিতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়করের বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসেছে এ পর্যবেক্ষণ। দুটি পৃথক রিটে জারি করা রুল খারিজ করে গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় দেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায় দুটি প্রকাশ করা হয়। দুটি রায়ই লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া। একটি রায় ৩২ পৃষ্ঠার, অন্যটি ১৫ পৃষ্ঠার। আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, সরদার জিন্নাত আলী ও ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ-আল-মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম জামিউল হক ফয়সাল, মো. আবদুস সামাদ আজাদ।


গ্রামীণ কল্যাণের রিট দুটিকে কর ফাঁকির ‘আদর্শ মামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, মামলা দুটি মীমাংসিত বিষয়টিকে প্রলম্বিত করেছে। এর মাধ্যমে সরকারের ন্যায্য রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি গ্রামীণ কল্যাণ। অথচ নথিপত্র ও বিদ্যমান আইনের আলোকে বিচার করলে আবেদনকারীর (গ্রামীণ কল্যাণ) দাবির পক্ষে কোনো জোরালো ভিত্তিই নেই; যে কারণে সংশ্লিষ্ট রুলটিতে কোনো সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে রুলটি খারিজ করে আয়কর আদায়ের ওপর দেওয়া আগের স্থগিতাদেশ বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হলো, গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য যথাসম্ভব দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।


মামলার নথি থেকে জানা যায়, পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে বিপুল পরিমাণ আয়কর দাবি করে কর বিভাগ। পরে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা কর অঞ্চল-১৪ পৃথক নোটিসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা কর দাবি করে। ওই কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছর হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট দায়ের করে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন।


দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট একটি রায় দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে এনবিআর পৃথক লিভ টু আপিল করে। আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করে মূল বিষয়বস্তুর ওপর পুনরায় শুনানির জন্য মামলাগুলো হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। এরপর নতুন করে শুনানি শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের রিট খারিজ করে রায় দেন। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটিকে এনবিআরের দাবি করা কর পরিশোধ করতে হবে।


তবে ওই রায় পরে প্রত্যাহার করা হয়। কারণ হিসেবে জানানো হয়, বেঞ্চের একজন বিচারক অতীতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে একই মামলায় সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ফলে রায়টি ‘ডিফেকটিভ’ বা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে বিবেচনায় ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট তা প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রধান বিচারপতি মামলাটি বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন নতুন বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। নতুন বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন।