তারকাদের বিদেশমুখিতা থামছে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়ছে। জুলাই আন্দোলনের পর কাজে বাধা ও অনিরাপদ বোধ থেকে অনেকের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত এক দশকেই শতাধিক শিল্পী-কলাকুশলী ও তারকা বিদেশে স্থায়ী হয়েছেন। এঁদের বেশির ভাগই গেছেন ইউরোপ-আমেরিকায়। উন্নত জীবন, নিরাপত্তা, বেশি আয়, দেশে কাজের সুযোগ কমে যাওয়াই বড় কারণ বলে তাঁরা জানিয়েছেন। সেখানে গিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠিত পেশা বদলে ভিন্ন পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।
তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয় এবং শিল্পচর্চায় বাধা পেয়েও দেশ ছেড়েছেন অনেকে। মোটাদাগে দুবার দল বেঁধে শিল্পীদের দেশ ছাড়ার ঘটনা লক্ষ করা গেছে। আমেরিকার অভিবাসন নীতিতে শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য ভিসাপ্রাপ্তি সহজ হওয়ায় গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিল্পীদের দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়েছিল। করোনা মহামারির পরও ঢাকার শোবিজে কাজ কমে যাওয়ায় অনেকে দেশ ছেড়েছেন। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। ৫ আগস্টের পর আমেরিকায় নাগরিকত্বের আবেদনের ফাইল তৈরিতে শিল্পীদের সাহায্য করেন বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পী, যারা আগে থেকেই দেশটির নাগরিক। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় শিল্পীদের অনেকে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ নিয়েছিলেন। অনেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছেন। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, অভিনয় শিল্পী রোকেয়া প্রাচী, ফেরদৌস, রিয়াজ, নিপুণ, সোহানা সাবা, মেহের আফরোজ শাওন, তানভীন সুইটি, জ্যোতিকা জ্যোতি দেশেই রয়েছেন। অনেকে দেশ ছাড়ার সাহস দেখাচ্ছেন না, যদি বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার হতে হয়, এই ভয়ে। রাজনীতির সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক নেই, বরং এমন অনেক শিল্পীই দেশ ছাড়তে চাইছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজপথে ও অন্তর্জালে শোবিজের যারা সোচ্চার হয়েছিলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের অনেকেই পরে প্রকাশ্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। সংগীত শিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান এবং অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের নাম এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদও জানিয়েছেন, গণ অভ্যুত্থানের পর ১২ মাসেও তাঁকে অভিনয়ের জন্য কেউ ডাকেনি। অর্থাৎ কাজ পাননি। জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের সময় বেশ আলোচনায় এসেছিল হোয়াটসঅ্যাপের একটি চ্যাট গ্রুপ ‘আলো আসবেই’। এই গ্রুপের সদস্যদের অনেকেই শোবিজের মানুষ। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছিলেন অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস। ৫ আগস্টের পরপরই তিনি দেশ ছেড়ে কানাডা চলে যান। অবশ্য আগে থেকেই তিনি দেশটির নাগরিক। অভিনেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য সুবর্ণা মুস্তাফা ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক যাওয়ার পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে এবং তাঁর স্বামী নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদকে আটকে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে এই দম্পতি ব্যাংককেই রয়েছেন। বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে তাঁরা কিভাবে দেশটিতে গেলেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১ আগস্ট দেশ ছাড়েন অভিনেত্রী তারিন জাহান। প্রথমে যান তুরস্কে, সেখান থেকে ভারতে। বর্তমানে সেখানেই রয়েছেন এই অভিনেত্রী। তবে যুক্তরাষ্ট্রেই ঠাঁই নিয়েছেন বেশির ভাগ শিল্পী। এ তালিকায় রয়েছেন অভিনয় শিল্পী জায়েদ খান, সাইমন সাদিক, হৃদি হক, লিটু আনাম, অমিত হাসান, মাহিয়া মাহি, সাজু খাদেম, নির্মাতা অমিতাভ রেজা, এস এ হক অলিক, পিকলু চৌধুরী, নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামূল, কণ্ঠশিল্পী রেশমী মির্জা প্রমুখ। পরিবারসহ ফ্রান্স চলে গেছেন সংগীত শিল্পী রাহুল আনন্দ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিজে সমর্থন দিয়েছিলেন, নেমেছিলেন রাজপথেও। অথচ আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ের দিনে আক্রান্ত হন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। ৩২ নম্বর সংলগ্ন রাহুল আনন্দের বাড়িতেও তখন হামলা চালায় আন্দোলনকারীরা। শিল্পীর হাতে তৈরি শতাধিক বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে দেয় জনতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ দেশের শোবিজ জগতের প্রচুর তারকা বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এর ৮০ ভাগই যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেন। আগামী অন্তত পাঁচ বছর সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকতে চান তারা। বিশেষ করে গ্রেপ্তার, আইনি জেরা কিংবা অন্য যেকোনো হয়রানি এড়াতেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত। আবার কিছু তারকা উন্নত জীবনের আশায়ও বিদেশে স্থায়ী হতে চান। ৫ আগস্টের পর চলচ্চিত্র জগতের অনেকেই লাপাত্তা হয়ে যান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তারা। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন- চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ ও রিয়াজ। ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর অনেকটাই লাপাত্তা হয়ে যান ফেরদৌস। একটি সূত্র মতে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, আবার কারও মতে তিনি দেশেই আছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রচারণার নিয়মিত মুখ ছিলেন চিত্রনায়ক রিয়াজ। তিনিও ৫ আগস্টের পর দেশত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। আবার কারও মতে তিনি দেশেই আছেন। ফেরদৌস যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী একাধিক তারকা। অন্যদিকে, রিয়াজ কোথায় আছেন তা এখনো জানা যায়নি। বাংলাদেশের অর্ধশতেরও বেশি শোবিজ তারকা দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হতে আবেদন করেছেন। এদিকে, উন্নত জীবনের আশায় ও রাজনৈতিকসহ নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার তালিকায় রয়েছেন- লিটু আনাম, বাপ্পী চৌধুরী, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, অমিত হাসান, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি, সোনিয়া হোসেন, সাজু খাদেম, রেশমী মির্জা প্রমুখ। সুপারস্টার শাকিব খান জুলাই আন্দোলনের বেশ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড পেয়েছেন। তার সাবেক দুই স্ত্রী- চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস এবং শবনম বুবলীও রয়েছেন সেখানে স্থায়ী হতে চাওয়ার তালিকায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন চিত্রনায়িকা শাহনূরও। তিনিও সেখানে স্থায়ী হতে চাচ্ছেন। অন্যদিকে, চিত্রনায়িকা অধরা খানও এরই মধ্যে কানাডায় স্থায়ী হয়েছেন। বিগত পতিত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট চিত্রনায়িকা নিপুণ আক্তারও দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেয় ইমিগ্রেশন পুলিশ। বর্তমানে তিনি দেশেই রয়েছেন। তবে শোবিজ তারকাদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পেছনের কারণ জানাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু অভিনেতা মিশা সওদাগর বলেন, দেশে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ না থাকাতেই শিল্পীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তিনি জানান, শিল্পীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসাই তাদের দেশ ছাড়ার প্রধান কারণ। এই অভিনেতার কথায়, ‘কাজ না থাকলে শিল্পীদের কী করার আছে? এক সময় আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এফডিসিতে শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এখন সেই এফডিসি প্রায় নিঃস্তব্ধ। যারা দেশ ছেড়েছেন, তাদের কারও কি যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল? জায়েদ খান, অমিত হাসান, মৌসুমী, ইমন, সাইমন, মাহিয়া মাহি বা আলেকজান্ডার বো-সহ অনেকেই এখন বিদেশে রয়েছেন, কাজ থাকলে তারা কেউই যেতেন না।’ উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে অমিত হাসান, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, মাহিয়া মাহি, সাজু খাদেমসহ অনেক তারকাই বিদেশের স্থায়ী নাগরিকত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি থাকার সুযোগ নিয়েছেন। খোদ মিশা সওদাগরের পরিবারও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী। অভিনয়ের প্রয়োজনে তিনি দেশে থাকলেও বছরের বড় একটি সময় তাকে মার্কিন মুলুকেই কাটাতে হয়। ২০০০ সালে সপরিবারে আমেরিকায় স্থায়ী হন শাবানা। ২০২২ সালে ওই দেশে নাগরিক হন শাকিব খান। অভিনয়ের জন্য দেশে আসেন আবার অবসর সময়ে চলে যান আমেরিকায়। তারও বহু আগে কলকাতায় স্থায়ী হন বেদের মেয়ে-খ্যাত অঞ্জু ঘোষ। ২০১২ সালে শাবনূর স্থায়ী হন অস্ট্রেলিয়ায়। মডেল-অভিনেত্রী মোনালিসা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান ২০১৮ সালে। গত দশকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়া তারকাদের মধ্যে আরও আছেন- শিল্পী টনি ডায়েস, কাজী খুরশীদুজ্জামান উৎপল, তমালিকা কর্মকার, ইপসিতা শবনম শ্রাবন্তী, রোমানা, রিচি সোলায়মান, নওশীন নাহরিন মৌ, আদনান ফারুক হিল্লোল, শান্তা ইসলাম, লুৎফুন নাহার লতা, শামীম শাহেদ, কাজী মারুফ, মাহবুবা ইসলাম সুমী, বিপাশা হায়াত, তৌকীর আহমেদ, মৌসুমী, আনিসুর রহমান মিলন, নোভা ফিরোজ, সাঈদ বাবু, বিপাশা হায়াত ও তৌকির প্রমুখ। সংগীত শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লব, ইমন সাহা। রয়েছেন মডেল রিয়াও। কানাডায় স্থায়ী হয়েছেন গায়ক তপন চৌধুরী, অভিনেত্রী শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি, অগ্নিলা, আমব্রিন প্রমুখ।
যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হয়েছেন অভিনয় শিল্পী দিলরুবা ইয়াসমিন রুহী, সোনিয়া, শায়না আমিন, স্মৃতি ফামি, সংগীতশিল্পী প্রীতম আহমেদ প্রমুখ। এ ছাড়া অভিনেত্রী তামান্না আছেন সুইডেনে।