শ্রমিক অসন্তোষে বড় ধরনের উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ, কারখানায় হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় গত সোমবার পর্যন্ত ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ কমানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিদেশি ক্রেতারা। ইতোমধ্যে কিছু অর্ডার ভারত, পাকিস্তানসহ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকেরা।


শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অস্থিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে বর্তমান উৎপাদন ও রপ্তানির পাশাপাশি আগামী কয়েক মাসের নতুন ক্রয়াদেশও হারাতে পারে বাংলাদেশ। এতে কারখানার আয় কমে শ্রমিকদের বেতন, উৎসব ভাতা ও ব্যাংকঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সংকুচিত হবে। বিশেষ করে রমজান ও ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে।


ক্রয়াদেশ কমানোর হুঁশিয়ারি ক্রেতাদের : ক্রয়াদেশ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো। উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সূচি জানতে কারখানার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন ক্রেতারা। ঢাকায় সুইডেনভিত্তিক একটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী দুই মাসের ক্রয়াদেশ কমাতে পারে তাদের প্রতিষ্ঠান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাঁর মতে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বড় কোনো উদ্বেগ থাকবে না।


ফ্যাব্রিকা নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, উৎপাদন শেষ করতে না পারায় জাহাজীকরণের সময় বাড়ানোর অনুরোধে ক্রেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিছু ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া বন্ধ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ইতোমধ্যে কিছু অর্ডার ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও ক্রয়াদেশের ঘাটতিতে শিল্প খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে অর্ডার বাতিল বা কমে গেলে রমজান ও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে।


বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত সোমবার এক বিদেশি ক্রেতার প্রতিনিধি তাঁর কারখানায় যোগাযোগ করে পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা জানতে চেয়েছেন। দ্রুত উন্নতি না হলে বাংলাদেশ ক্রয়াদেশ হারাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। আরেক ক্রেতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাঁদের জন্য পোশাক তৈরি করা কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চালু কারখানাগুলোতেও অন্য কারখানার শ্রমিকদের হামলার খবর পাচ্ছেন তাঁরা। জাহাজীকরণে বাড়তি ব্যয়, বাতিলের ঝুঁকি : উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারার ঝুঁকি বাড়ছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হলে রপ্তানিকারকদের কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে। এতে মুনাফা কমার পাশাপাশি ক্রেতারা মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন; এমনকি ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কাও রয়েছে।


বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রায় ১০০ ডলারের সমান। প্রায় এক মাস ধরে শ্রমিক প্রতিনিধিরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিও ছিল তাঁদের। গত রবিবার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ওই দিন ৫০০টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের পর গত সোমবার বন্ধ কারখানার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭০০ তে পৌঁছায়।


তবে শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। এক হিসাবে বন্ধ ৬৯০ কারখানায় ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য হিসাবে সোমবার বন্ধ হওয়া প্রায় ৭০০ কারখানায় ৯ লাখের বেশি শ্রমিক কর্মরত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুই হিসাবের ভিত্তি ও শ্রমিকসংখ্যার পরিধি এক কি না, তা সংশ্লিষ্ট সূত্রের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।


অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধের শঙ্কা


বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কারখানা চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে বা কারখানায় হামলা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আবার বৈঠক হবে। প্রয়োজনে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।


এদিকে মিরপুরে পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গত দুই দিনে ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাভার ও গাজীপুরেও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে।


শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক করা না গেলে সংকটের প্রভাব কারখানার ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়া, জাহাজীকরণে বিলম্ব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে দেশের পোশাক রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।