লাগাতার ধর্মঘটে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। জেটিতে অলস বসে আছে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা ১১টি জাহাজ। ক্রেনের নড়াচড়া নেই। পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ। খালাস পণ্য বন্দর থেকে বাইরে ডেলিভারি হচ্ছে না। বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না রপ্তানি পণ্য। নেই চিরচেনা কোলাহল, হাঁকডাক। সুনসান নীরবতা চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) অপারেশনাল কার্যক্রমে।
শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার ধর্মঘটে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দিনদিন কঠোর হচ্ছে আন্দোলনের তীব্রতা। তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আমদানি-রপ্তানিকারকরা। তাঁরা বলছেন, ‘বন্দর থেকে কাঁচামাল শিল্পকারখানায় নিতে না পারলে উ পাদন ব্যাহত হবে। আর উ পাদন না হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে রপ্তানি। দেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশই হয়ে থাকে এ বন্দরের মাধ্যমে। তাই বন্দর এক দিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।’
এদিকে আন্দোলনের শুরুতে পণ্য খালাস ও ডেলিভারিতে অচলাবস্থা দেখা দিলেও মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা জেটিতে জাহাজ চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছেন। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জেটি থেকে কোনো জাহাজ বহির্নোঙরে যেতে পারেনি। একইভাবে বহির্নোঙর থেকে জেটিতে প্রবেশও করতে পারেনি। বন্দরের বহির্নোঙর কর্মসূচির আওতামুক্ত হলে সেখান থেকে জেটিতে আসতে না পারার কারণে বহির্নোঙরে তৈরি হচ্ছে জাহাজজট। এদিকে পরিবহন বন্ধ থাকায় জেটি ও জাহাজে আটকে আছে বিপুলসংখ্যক আমদানি কনটেইনার।
শনিবার শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রথম তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে কর্র্মবিরতি পালন করা হলেও মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ ঘণ্টায়। ওই দিনই ডাক দেওয়া হয়েছে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি। প্রথম দিকে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও তাদের সাবেক সিবিএ বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। বর্তমানে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে চলছে সেই আন্দোলন। মঙ্গলবার বিকালে বন্দর ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দিয়ে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অর্থা সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া থেকে যত দিন না সরবে তত দিন কর্মবিরতি চলবে। গতকাল আন্দোলনের পঞ্চম দিনে বন্দররক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচারীর সমর্থনে বন্দরের কোনো অংশে অপারেশনাল কাজ হচ্ছে না। এমনকি বহির্নোঙর থেকে বিদেশি জাহাজ বন্দরের আনা-নেওয়াও বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বা সরকার এখনো কোনো আলোচনার প্রস্তাব দেয়নি জানিয়ে এই শ্রমিকনেতা বলেন, ‘আমরা আন্দোলন অব্যাহত রাখছি।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার চুক্তি প্রক্রিয়া থেকে সরেনি। তাই আমাদেরও আন্দোলন থেকে সরার সুযোগ নেই। সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ না করলে আমাদের দাবি মেনে নেবে না। তাই আমরা মঙ্গলবার থেকে ট্যাগবোট বন্ধ করে দিয়েছি। মাদার ভেসেলের পাইলটিং হচ্ছে না। ফলে বহির্নোঙরে কিছুটা জাহাজজট হচ্ছে।’
বন্দরসংশ্লিষ্ট ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা সচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে কয়েক দিন ধরে রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না। প্রায় ১১ হাজার রপ্তানি কনটেইনার ১৯টি ডিপোতে আটকে আছে। অন্যদিকে বন্দর থেকে কোনো আমদানি ও খালি কনটেইনার ডিপোতে আসছে না।’
বন্দরের অচলাবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘এভাবে বন্দর অচল হয়ে পড়ে থাকলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুনাম নষ্ট হবে বহির্বিশ্বে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অচল, অথচ সরকারের তরফে সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, ‘বন্দরে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কারখানার বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আটকে আছে। এ কারণে পণ্য উ পাদন ব্যাহত হচ্ছে। উ পাদন না হলে রপ্তানি হবে না। বেসরকারি ডিপোগুলোতে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি পণ্য আটকে থাকায় বিদেশি ক্রেতার কাছে পাঠানো যাচ্ছে না। ক্রেতারা এরই মধ্যে এয়ার শিপমেন্টের জন্য চাপ দিচ্ছে, যা খুবই ব্যয়বহুল।’
তিনি আরও বলেন, ‘রমজানে ভোগ্যপণ্যের যে চাহিদা তার ২৫-৩০ শতাংশ এখনো জাহাজে আছে। এগুলো খালাস না হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সংকট তৈরির অজুহাত পেয়ে যাবেন।’
কর্মবিরতিতে বন্দর ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ : চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক কর্মবিরতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর একটি হোটেলে বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সভা শেষে তাঁরা এ উদ্বেগের কথা জানান। এ সময় তারা সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বেপজিয়া, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভা শেষে এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এমএ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বন্দরে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক কর্মবিরতিতে শুধু আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি না। তারাও (শ্রমিক) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ অনেক শ্রমিক দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে, তারাও মার খাচ্ছেন। যা বলি, ব্যবসায়ীরা চোখে অন্ধকার দেখছে।’
তিনি বলেন, ‘বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করব- বাংলাদেশের লাইফ লাইন, ৯০ শতাংশ আমদানি রপ্তানি যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয় তা চারদিন বন্ধ থাকতে পারে না। একটা বিষয় সকলে খেয়াল করবেন, আগেও এক দিন, দুই দিন বন্দর বন্ধ ছিল কিন্তু জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। এবার প্রথম জাহাজ চলাচল বন্ধ। ইন্টারন্যাশনালি সবাই এটার দিকে তাকিয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা সুনাম না, বরং দুর্নাম বয়ে আনছে। সরকারকে অনুরোধ করব অতিসত্বর আলোচনা করার জন্য। খুব একটা বড় সমস্যা নয়। আমরা যা আলোচনা করেছি, এটাতে কী উপকার হবে, কী অপকার হবে তা যদি তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, নেগোসিয়েশনের কোনো বিকল্প নেই। সরকার গত চার দিন করেনি। এখন সত্বর আলোচনা শুরু করলে, সেটি রাত হোক, দিন হোক সেটি কোনো ব্যাপার নয়, তারা কথা দিয়েছে কাজে অংশ নেবে।’