রমজান শুরু হতে এখনো প্রায় এক মাস বাকি। অথচ এরই মধ্যে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম চড়া হতে শুরু করেছে। রোজায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত খেজুর, ছোলা, ছোলার ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের দাম একের পর এক বেড়েছে। একই সঙ্গে মাছ ও মাংসের মতো প্রোটিনজাত পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। তবে রোজার বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে পিঁয়াজে। বর্তমানে পিঁঁয়াজের ভরা মৌসুম এবং দেশীয় উৎপাদন ভালো হওয়ায় এর দাম তুলনামূলক কম রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। যদিও আদা-রসুনসহ মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। দুই মাস ধরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়। সম্প্রতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে প্রধান এ খাদ্যশস্যের দাম। গমের বাজারেও মণপ্রতি ২০-৩০ টাকা দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে আটা ও ময়দার দামে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।


আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের ব্যস্ততার সুযোগে বাজার তদারকি কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে-এমন অভিযোগ করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে বলে দাবি তাদের। এর মধ্যে সম্প্রতি সরকার দেশের প্রায় সব স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।


বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রোজা যত ঘনিয়ে আসবে, দাম ততই বাড়তে পারে। সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমানো না গেলে বাজারে এ ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলেও মত তাদের। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রমজান এলেই এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সুযোগ নেয়। প্রকৃত সংকট না থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। বাজারে নজরদারি দুর্বল থাকলে এ প্রবণতা থামানো যায় না। তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে আমদানি ও মজুতের তথ্য রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো বাজারে হস্তক্ষেপ করা গেলে ছোলা, চিনি, খেজুর বা তেলের দাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তা না হলে রোজার বাজারে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, গত এক মাসে ছোলার দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ছিল ৮৫-৯০ টাকা। ছোলার ডালের দামও বেড়েছে। এখন প্রতি কেজি ছোলার ডাল কিনতে গুনতে হচ্ছে ১০৫-১১০ টাকা।


ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে সীমিত পরিসরে ছোলা উৎপাদন হলেও চাহিদার বড় অংশই আসে অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার ও তানজানিয়া থেকে। রমজান সামনে রেখে এবার আগেভাগেই ছোলা মজুত করা হয়েছে। ছোটবড় ব্যবসায়ীরা এলসি খুলে এসব পণ্য আমদানি করেছেন। তাই রোজায় ছোলার দাম আর বাড়বে না বলে তাদের দাবি। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আগেই মজুতের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম হাঁকিয়ে কৌশলে পণ্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে।


মিরপুরের একটি বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘রমজান এখনো শুরু হয়নি, কিন্তু বাজারে গেলে মনে হয় রোজা শুরু হয়ে গেছে। খেজুর, ছোলা, তেল-সব কিছুর দাম আগেই বেড়ে গেছে। আয় বাড়ে না, কিন্তু খরচ দিন দিন বাড়ছেই।’


ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকট ও আমদানিজনিত জটিলতার প্রভাবও বাজারে পড়ছে। কাওরানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী বলেন, ‘অনেক পণ্যের এলসি খুলতে দেরি হচ্ছে। আমদানির খরচ বেড়েছে। ছোলা, ডাল, চিনি-সবই মজুত আছে। কিন্তু রোজার সময় চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখন জোগানের ওপর নির্ভর করে দাম ওঠানামা করতে পারে।’


এদিকে প্যাকেটজাত চিনি বাজারে প্রায় নেই বললেই চলে। খোলা চিনির সরবরাহও সীমিত। ফলে দাম বেড়ে কেজিতে ১১০-১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজা সামনে রেখে চাহিদা বাড়লে এই দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রোজার বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। এ কারণে গত ডিসেম্বরে এই পণ্যের আমদানিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে শুল্ক কমলেও বাজারে খেজুরের দাম কমেনি। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি খেজুরের সর্বনিম্ন দাম ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দাম ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। সাধারণ মানের জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকা কেজিতে। দাবাস ও তিউনিসিয়ান জাতের খেজুর বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ১৫০-৪৫০ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ৫০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভালো মানের আজওয়া খেজুরের দাম এখন কেজিতে ৮৫০-১১০০ টাকা। ইরানি মরিয়ম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৭০০-৮৫০ টাকা কেজিতে। সৌদি মরিয়ম খেজুরের দাম কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে এখন ৯০০ টাকার কাছাকাছি। জাম্বো মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা কেজিতে। সাধারণ মেডজুল ১১০০-১২০০ টাকা এবং মাবরুম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১১০০-১৫০০ টাকা কেজিতে।


ভোজ্যতেলের বাজারেও স্বস্তির খবর নেই। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে পাম ও পাম সুপার তেলের দাম আগের তুলনায় বেশি।


ব্রয়লার মুরগির দাম গত কয়েক সপ্তাহে কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে এখন প্রায় ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ডিমের দাম এখন কম থাকলেও সামনে দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। গরু ও খাসির মাংসের দামও বাড়তির দিকে, যা সাধারণ মানুষের খাদ্যব্যয় আরও বাড়াচ্ছে।