বিশ্বজুড়ে পোশাকের বাজারে পরিবর্তন এসেছে ভোক্তার চাহিদা ও ফ্যাশন প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। একসময় যেখানে তুলা বা কটননির্ভর পোশাকের আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন জায়গা করে নিচ্ছে টেকসই, আরামদায়ক, বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর ম্যানমেড ফাইবার (এমএমএফ) পোশাক। বৈশ্বিক পোশাক বাজারের বড় অংশ এখন কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের দখলে থাকলেও এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলক দুর্বল।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও এমএমএফ পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা ক্রমেই কৃত্রিম তন্তু, বিশেষ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত (রিসাইকেলড) ফাইবারের পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কম পানি ব্যবহার এবং সার্কুলার ইকোনমির ধারণার কারণে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে এমএমএফ পোশাক বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এমএমএফ পোশাকের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেন্ট্রাল ওয়্যার হাউস দ্রুত বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক একটি শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে মন্দাভাবের মধ্যেও বাংলাদেশের ম্যান-মেড ফাইবার ও ফিলামেন্ট খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এমএমএফ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৪১৪ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩৯৫ দশমিক ০১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার।
তবে বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় এ পরিমাণ এখনো খুবই সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে এমএমএফ পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এখনো প্রধান ভূমিকা রাখছে তুলাভিত্তিক পোশাক। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তাই দেশটির বাজারে এমএমএফ পোশাকের শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিটিএমএ। বৈঠকে মার্কিন তুলা ও ম্যান-মেড ফাইবার ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাকের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতির আহ্বান জানানো হয়। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে সংগঠনটির প্রতিনিধিদল বৈঠকে বাংলাদেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) উত্তরণের পর রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও বৈঠক করেন বিটিএমএ সভাপতি। ওই বৈঠকেও দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির ধারা ৫.৩ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। বাণিজ্য চুক্তির ধারা ৫.৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার আমদানি করে পোশাক উৎপাদন করে, তাহলে সেই পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এই সুবিধা কার্যকর হলে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও ফাইবার শিল্পের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের পোশাক বাজারে এমএমএফের গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই এখনই এই খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।