সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। আশ্বাসে ভরসা না পেয়ে অনেকেই আগেভাগেই তেল সংগ্রহে পাম্পে ভিড় করছেন।
গতকাল দিনভর এবং রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও সেই লাইন পাশের প্রধান সড়ক পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে, ফলে সৃষ্টি হয় যানজট ও ভোগান্তি। সরকার যানবাহনভিত্তিক তেলের নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করলেও পাম্পে সরবরাহ করা তেল দিয়ে সব ক্রেতার চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে অনেক পাম্প মালিক আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ‘তেল নেই’ লেখা পোস্টার টানিয়ে রাখছেন, যাতে তেল শেষ হলে ক্রেতাদের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য আলাদা লাইনে তেল দেওয়া হচ্ছে। সকালে তেল না পেয়ে অনেকেই রাতে আবার পাম্পে ফিরে আসছেন। মিরপুর শ্যাওড়াপাড়ার বাসিন্দা এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আরমান রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার সময় তেল নিতে এসে দীর্ঘ লাইন দেখে ফিরে যাই। রাতে আবার বিজয় স্মরণীর একটি ফিলিং স্টেশনে এসে দেখি লাইন জাহাঙ্গীর গেট ছাড়িয়ে গেছে। এতে সময়মতো অফিস করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি রোধে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশি টহল জোরদারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ইফতারের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে মোবাইল কোর্টের অভিযান ও নজরদারি শুরু হয়। অভিযানের সময় তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশন, ক্লিন ফুয়েল স্টেশন, রয়েল ফিলিং স্টেশন ও তশোফা ফিলিং স্টেশনসহ কয়েকটি পাম্পে নজরদারি করা হয়। জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরির লক্ষ্যে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, অতিরিক্ত মজুত, খোলাবাজারে বিক্রি ও পাচারের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি এবং পাচার রোধে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে তেলের মজুত বাড়ছে, তবে ইরান যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানিতে রেশনিং চালু থাকবে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আজ একটি তেলবাহী জাহাজ নোঙর করেছে এবং আরেকটি জাহাজও আসছে। এগুলো থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুত আরও বাড়বে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছেমতো তেল ব্যবহার করা যাবে।
মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত। তাই মজুত থাকা তেল সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।
সাড়ে ৩ লাখ টন এলএনজি-এলপিজি নিয়ে বন্দরে পাঁচ জাহাজ : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এসে পৌঁছেছে জ্ব¦ালানিবোঝাই পাঁচটি জাহাজ। কয়েক দিনের মধ্যে পৌঁছাবে আরও তিনটি। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরুর আগেই এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ৮টি জাহাজের মধ্যে ৫টিতে রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার টন এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস)। দুটিতে আছে প্রায় ৪১ হাজার টন এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস)। একই দেশ থেকে আজ (৯ মার্চ) ৬২ হাজার ৯৮৭ টন এলএনজিবোঝাই জাহাজ লুসাইল, ১১ মার্চ ৫৭ হাজার ৬৬৫ টন এলএনজি নিয়ে গ্যালায়েল এবং ১৪ মার্চ ৬২ হাজার টন এলএনজি নিয়ে লিব্রেথা নামের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা। এর আগে ৬৩ হাজার ৩৮৩ টন এলএনজি নিয়ে কাতার থেকে ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে এএল জোরে নামে একটি জাহাজ। এ ছাড়া ৬৩ হাজার ৭৫ টন এলএনজি নিয়ে ৫ মার্চ বন্দরে পৌঁছেছে এএল জাসাসিয়া।
এদিকে গতকাল ওমান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজিবোঝাই জাহাজ এলপিজি সেভেন। তার আগে একই দেশ থেকে ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলজিপি নিয়ে এসেছে জিওয়াইএমএম নামে একটি জাহাজ। এ ছাড়া ৫ হাজার ১৯ টন এমইজি (মনো ইথিলেন গ্লাইকোল) বোঝাই একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৫ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলে বৈশি^ক তেল পরিবহন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। গ্লোবাল অয়েল করিডর হিসেবে খ্যাত সরু পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। এ প্রণালি ব্যবহার করে ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে পণ্য আনা-নেওয়া হয়।