বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিনিয়োগে খরার কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এজন্য এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভোগ এবং চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার কথা বলেছে আইএমএফ।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির বোর্ড সভায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অন্যদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। যা গত জুলাইয়ে বলেছিল ৪.৫ শতাংশের কথা।
সম্প্রতি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সম্প্রতি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেখানে অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় কুইক রেসপন্স এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর সংস্কারগুলো নিয়েও অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশনা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের গতি আটকে রেখেছে। এ চাপের প্রতিফলন মিলেছে এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসে। সেপ্টেম্বরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে (এডিও) এডিবি বাংলাদেশের ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে।
এর আগে জুলাইয়ের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল সংস্থাটি। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৫ শতাংশ কমিয়েছে এডিবি। এদিকে আইএমএফের সর্বশেষ বাংলাদেশ মিশনের মূল্যায়নেও অর্থনীতির জন্য একাধিক ঝুঁকির কথা বলেছে। সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক পণ্যের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানির ধাক্কা : গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পরিবহন খরচের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের পরিবহন ভাড়াও। সামনের মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। কেননা জ্বালানি ব্যয় বাড়লে প্রথম ধাক্কা আসে পরিবহন খাতে।
এরপর বাড়ে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এডিবির সেপ্টেম্বরের আঞ্চলিক মূল্যায়নেও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংস্থাটি বলেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম ও অস্থিরতা উভয়ই বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও বিনিয়োগে গতি ফেরানোর বিষয়গুলো সামলাতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার দীর্ঘায়িত হলে ঋণের খরচও বেশি থাকবে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে। আবার বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমীকরণ দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতির তৃতীয় বড় ঝুঁকি বিনিয়োগ : এডিবির সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি কমানোর অন্যতম কারণ হিসেবে বাংলাদেশে দুর্বল বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধান না হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। আর ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। আইএমএফও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনকে জরুরি উল্লেখ করেছে।
সংস্থাটির মতে, আর্থিক খাতের সংস্কার ও ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দূর করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। আইএমএফ মনে করে, অর্থনীতির এই তিন ঝুঁকি আলাদা নয়। একটি আরেকটিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ সুদহার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি বজায় থাকলে ঋণের ব্যয় বেশি থাকবে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন উদ্যোক্তারা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে দেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খাতেও ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
অন্যদিকে বিনিয়োগে তিন বাধা দেখছেন আরেক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও স্পষ্ট। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ দুটি খাত ঠিক না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না এবং বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী হবেন না। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে সক্ষমতা থাকার পরও শিল্পকারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাজারে চাহিদা দুর্বল হয় এবং এমন অনিশ্চিত সময়ে নতুন বিনিয়োগে কেউ আগ্রহী হন না।